logo
Search

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ বছরের যুদ্ধ

বিশ্বজুড়ে বিপর্যস্ত কোটি মানুষের জীবন

৯/১১ হামলার ২৫ বছর পরও এর পরিণতি শেষ হয়নি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ সদস্য চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে আঘাত হানে। এতে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হয় একের পর এক যুদ্ধ, ক প্রজন্মের জন্য ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিকে আমূল বদলে দেয় এবং বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ৪৫ লাখ মানুষের মৃত্যু

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় নয় লাখ ৪০ হাজার মানুষ সরাসরি যুদ্ধে এবং ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় মারা যান।

আফগানিস্তান: প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার নিহত

৯/১১-এর এক মাসেরও কম সময় পর, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। তালেবান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত হলেও যুদ্ধ চলে প্রায় ২০ বছর।

কস্ট অব ওয়ারের হিসাবে, যুদ্ধে সরাসরি প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হন। খাদ্যসংকট, রোগ, চিকিৎসার অভাব এবং অবিস্ফোরিত বোমা ও স্থলমাইন আরো বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করে।

ইরাক: প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার নিহত

২০০৩ সালের ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন শুরু করে। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের দাবি ছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। পরে সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

ইরাকের তৎকালীন ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ওমর স্মরণ করেন, বোমা হামলার শব্দে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তার কয়েকজন বন্ধু যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখতে বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেননি।

কস্ট অব ওয়ারের হিসাবে, ইরাক যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ নিহত হন।

ড্রোন ও বিমান হামলা

স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক-সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালায়।

ব্রিটেনভিত্তিক ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবে, ২০০৪ সালের পর পাকিস্তানে শত শত মার্কিন হামলায় চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকশ বেসামরিক নাগরিক। ইয়েমেনে ৮৫৩ ও সোমালিয়াতে ১৮৮ থেকে ২৭৬ জন নিহত হন।

২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে চলা বিক্ষোভ দমনের সময়, জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো একটি বিমান হামলা চালায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, গাদ্দাফি বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ার ও নিহত হওয়ার আগে সাত মাস ধরে দেশটিতে প্রায় নয় হাজার ৭০০টি হামলা চালানো হয়েছিল।

২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানেও হাজার হাজার বোমা নিক্ষেপ করা হয়। বেসামরিক প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত

কস্ট অব ওয়ারের হিসাবে, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুদ্ধের কারণে তিন কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

দুই দশক পরও এই বাস্তুচ্যুতি থামেনি। আফগানদের বড় একটি অংশ এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোতে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। ইরাকেও যুদ্ধের দুই দশক পর ১০ লাখের বেশি মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ সেনাসদস্যদের ওপর প্রভাব

আফগানিস্তানে আট লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার আহত হন। ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তিন হাজার ৪৮১ সদস্য নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হন।

যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও শারীরিক ক্ষতও গুরুতর। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-পরবর্তী প্রবীণ সেনাসদস্যদের সেবার পেছনে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে, যার বড় একটি অংশ এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

‘কস্টস অফ ওয়ার প্রজেক্ট’-এর পরিচালক স্টেফানি সাভেল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে সম্মুখ সমরে যত মার্কিন সেনা ও প্রবীণ সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন, তার চেয়ে চার গুণ বেশি সেনা ও প্রবীণ সদস্য আত্মহত্যায় প্রাণ হারিয়েছেন।’

চিরস্থায়ী যুদ্ধ: খরচ ৮ ট্রিলিয়ন ডলার

দুই দশকের যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রবীণ সেনাদের ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় অন্তত আট ট্রিলিয়ন ডলার।

এই যুদ্ধগুলোর অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য এখনো পরিশোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে যুদ্ধক্লান্ত মার্কিন জনগণের মধ্যে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি আগ্রহও কমেছে।

কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের মতে, ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা সমর্থন পেয়েছিলেন, তাদের আমলেও বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান ও বিমান হামলা আরো জোরদার হয়েছে।

২৫ বছর পর নাইন ইলেভেন পরবর্তী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাই শুধু নিহত ও ধ্বংসস্তূপ নয় বাস্তুচ্যুতি, মানসিক আঘাত, অর্থনৈতিক বোঝা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা যুদ্ধের ক্ষত।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

এমএম