কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপসাগরীয় অঞ্চল সফরের এক বছর পর পর্যটন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মার্কিন পুঁজি ওপর নির্ভর করে ভূরাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল তেল-পরবর্তী ভবিষ্যতের যে স্বপ্ন এই অঞ্চল দেখেছিল, তা একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে।
ট্রাম্প তার সফরে যে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন, তা এখন অনিশ্চিত।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ‘সোনালী যুগ’ এখন অনিশ্চিত। ট্রাম্প বলেছিলেন যে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থ কাজে লাগানো হবে।
ট্রম্পের উপসাগরীয় অঞ্চল সফর এমন একটি ধারণা তৈরি করেছিল যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক বিনিয়োগ এবং ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ সবই সম্ভবত উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হবে।
কনস্টেলেশনের সিইও জো ডোমিঙ্গেজ অ্যাক্সিওসকে বলেন, ইরান সস্তা ড্রোন দিয়ে সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালাতে সক্ষম বলে প্রমাণিত হওয়ার পর, সেখানে ২০ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার তৈরি করার জন্য কেউই আর তাড়াহুড়ো করছে না।
উপসাগরীয় নেতারা এক প্রজন্ম ধরে দুবাই মডেলকে নিখুঁত করার কাজ করেছেন। বিদেশী পর্যটক, প্রবাসী এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে স্থিতিশীলতাকে একটি বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিলাসবহুল হোটেল এবং বিমানবন্দরে ইরানের হামলা সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
অন্তর্নিহিত তথ্য
লিভ গল্ফে ব্যাপক বিনিয়োগের পর সৌদি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল সেখান থেকে বেরিয়ে গেছে। তেল রপ্তানি কমে যাওয়ায় সৌদির নগদ অর্থ সীমিতকরণের প্রথম বড় শিকার এটি।
বক্সিং সুপারফাইট, কমেডি উৎসব ও পরিকল্পিত শহর নিওমের ঝকঝকে ‘লিনিয়ার সিটির’ মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রকল্পগুলোর জন্য রিয়াদের অবাধ অর্থায়নের যুগ ২০৩৪ বিশ্বকাপের আগে মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, যা গত বসন্তে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার মার্কিন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এখন নিজস্ব শর্তে তেল উত্তোলনের জন্য ওপেক ত্যাগ করছে।
মতবিরোধের কেন্দ্রবিন্দু
সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল কার্টেল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেরিয়ে আসা হলো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সর্বশেষ ফাটল। ইরান যুদ্ধ এই ফাটলকে আরো গভীর করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আশা করেছিলেন যে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব এবং এর বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে, তিনি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে ইরান যেন আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে।
সৌদি যুবরাজের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এর বিপরীত - প্রথমে তিনি যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু তার তেলনির্ভর অর্থনীতির ক্ষতি যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন তিনি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন।
অন্যদিকে, সরাসরি আক্রমণের শিকার হওয়ার পর কাতার তার গ্যাস রপ্তানিতে একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কয়েক দশক ধরে করা প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন তার আব্রাহাম অ্যাকর্ডস দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসরাইলের সঙ্গে অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকছে।
অন্যদিকে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে আরো বেশি জোটবদ্ধ হচ্ছে সৌদি আরব।
যদিও ট্রাম্প এখন পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক ইসরাইল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার বিষয়ে আশাবাদী, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ বিষয়ে সৌদি মনোভাব শীতল হয়ে পড়েছে।
নেপথ্য কথা
সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মধ্যে ফাটল কতটা গুরুতর হয়ে উঠেছে তা বুঝতে অনেক সময় নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সূত্রের বরাত দিয়ে এক্সিওস জানিয়েছে, এই ফাটল গভীর হলেও এতে জড়িত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন।
সংকটের শুরুতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রিয়াদ এবং আবুধাবিকে বলেছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নেবে না।
ট্রাম্পের দূত এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার- যার সঙ্গে সৌদি ও আমিরাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তিনিও বিষয়টি থেকে দূরে ছিলেন।
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে, ওয়াশিংটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি আরব মিত্র এই যুদ্ধের ফলে আগের চেয়েও বেশি বৈরী হয়ে উঠবে।
বাস্তবতা
উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এখনো জ্বালানি ও পুঁজির বিশাল ভান্ডার রয়েছে এবং ওয়াশিংটনের সাথে তাদের একটি নিরাপত্তা সম্পর্কও আছে, যা এই যুদ্ধ আরো শক্তিশালী করেছে।
কিছু বিশ্লেষক ইরান সংকটকে উপসাগরীয় অর্থনীতির জন্য একটি অস্থায়ী ধাক্কা হিসেবে দেখছেন, কোনো অস্তিত্বের সংকট হিসেবে নয়।
মূলকথা
উপসাগরীয় অঞ্চল সফরের এক বছর পর, বিনিয়োগের জোয়ার নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিশ্রতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ইরান যুদ্ধের ক্ষতি পূরণ করতে তার মেয়াদের বাকি সময়ের চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে।
সূত্র: এক্সিওস
এনএইচ