মাসিক (পিরিয়ড), গর্ভাবস্থা কিংবা মেনোপজের মতো বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পর্যায়ে এই অস্বস্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। কেন এমন হয়, গরমে নারীদের শরীরে ঠিক কী পরিবর্তন ঘটে এবং কীভাবে এ সময় সুস্থ থাকা সম্ভব-জানুন বিস্তারিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা তাপমাত্রার প্রভাব বেশি অনুভব করেন। এর পেছনে রয়েছে হরমোনের পরিবর্তন, শরীরের গঠন, বিপাকক্রিয়া, বয়স এবং জীবনযাপনের নানা বিষয়। অতিরিক্ত গরম শুধু অস্বস্তিই বাড়ায় না, হৃদ্যন্ত্রের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
হরমোনের ওঠানামাই সবচেয়ে বড় কারণ
নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা মাসিক চক্র, গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান, পেরিমেনোপজ এবং মেনোপজের সময় নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কের সেই অংশে, যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের ঘাম সাধারণত পুরুষদের তুলনায় কিছুটা দেরিতে শুরু হয়। ফলে শরীরের অতিরিক্ত তাপ দ্রুত বের হতে পারে না। তাই একই পরিবেশে থেকেও অনেক নারীর বেশি গরম অনুভূত হতে পারে।
শরীরের গঠনও প্রভাব ফেলে
সাধারণভাবে নারীদের শরীরে চর্বির পরিমাণ পুরুষদের তুলনায় বেশি থাকে। এই চর্বি একদিকে শক্তির ভাণ্ডার হলেও অন্যদিকে তাপ ধরে রাখার একটি স্তর হিসেবেও কাজ করে। ফলে শরীরের ভেতরের তাপ সহজে বের হতে পারে না।
এ ছাড়া নারীদের শরীরের তাপমাত্রা মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ওঠানামা করে, যা গরমের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
মাসিকের সময় কেন গরম বেশি লাগে?
ডিম্বস্ফোটনের পর প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বাড়লে শরীরের মূল তাপমাত্রা প্রায় ০.৩ থেকে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এ কারণে মাসিক শুরুর আগের কয়েক দিনে অনেক নারীর বেশি গরম লাগে।
মাসিক চলাকালে রক্তক্ষরণের কারণে শরীর থেকে আয়রন কমে যেতে পারে। যাদের আগে থেকেই আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তারা সহজেই ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অবসাদ অনুভব করতে পারেন। প্রচণ্ড গরমে এসব সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
মেনোপজে কেন বাড়ে হট ফ্ল্যাশ?
পেরিমেনোপজ ও মেনোপজে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় অনেক নারীর হট ফ্ল্যাশ, রাতে অতিরিক্ত ঘাম এবং হঠাৎ শরীর গরম হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।
গরম আবহাওয়া এই উপসর্গগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি অনেকের ক্ষেত্রে উপকার দিলেও সবার জন্য এটি সমান কার্যকর নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
গর্ভাবস্থায় কেন বাড়ে তাপজনিত অস্বস্তি?
গর্ভাবস্থায় শরীরে রক্তের পরিমাণ, বিপাকক্রিয়া এবং পানির চাহিদা সবই বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধির কারণে শরীরকে অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে হয়। ফলে শরীরে বেশি তাপ উৎপন্ন হয় এবং সেই তাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরম বা হিট স্ট্রেস গর্ভবতী নারী ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, বিশ্রাম এবং সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি অনেক নারী পরিবারের সদস্যদের যত্ন নিতে গিয়ে নিজের খাবার, বিশ্রাম বা পর্যাপ্ত পানি পান করার বিষয়টি অবহেলা করেন। এর ফলে গরমের প্রভাব তাদের শরীরে আরও বেশি পড়ে।
কিছু ওষুধ যেমন-ডাইইউরেটিক বা উচ্চ রক্তচাপের নির্দিষ্ট ওষুধ তাপজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
হিট এক্সজশন ও হিট স্ট্রোকের লক্ষণ
অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বের হয়ে গেলে হিট এক্সজশন হতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও ক্লান্তি, পেশিতে টান, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, ফ্যাকাশে ত্বক ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
সমস্যা গুরুতর হলে হিট স্ট্রোক হতে পারে, যা একটি চিকিৎসা-জরুরি অবস্থা। শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়ে গেলে, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
গর্ভবতী, বয়স্ক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হলে গরমে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন।
নারীদের বেশি গরম লাগা কোনো কল্পনা নয়; এর পেছনে রয়েছে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তন ও হরমোনের প্রভাব। মাসিক, গর্ভাবস্থা কিংবা মেনোপজ প্রতিটি পর্যায়েই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ধরন বদলে যেতে পারে। তাই গরমের সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি পান এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে তাপজনিত জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, মায়ো ক্লিনিক, এয়ার ট্রাভেল অ্যান্ড প্রেগন্যান্সি, এনএইচএস
এমএম