logo
Search

জাতীয়

রিকশা চালক

‘৪৫ বছরে এমন বাজার কখনো দেখিনি’

আয় বাড়েনি, বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম; মাছ-মাংসের বদলে সবজিতেই ভরসা নিম্নআয়ের মানুষের। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামে চরম চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে খাবারের তালিকা থেকে একে একে বাদ দিতে হচ্ছে মাছ-মাংস। একসময় নিয়মিত গরুর মাংস কিংবা মাছ খাওয়া পরিবারগুলো এখন তুলনামূলক কম দামের সবজি দিয়েই মাসের পর মাস চালিয়ে নিচ্ছে সংসার।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টাউন হল কাঁচা বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বাজারে কথা হয় ৬০ বছর বয়সী রিকশাচালক মো. ইরফানের সঙ্গে। জীবনের প্রায় ৪৫ বছর রিকশা চালিয়ে সংসার চালানো এই শ্রমজীবী মানুষটির চোখে বর্তমান বাজার যেন একেবারেই অপরিচিত।

ইরফান বলেন, ‘আমি ৪৫ বছর ধরে রিকশা চালাই। জেনেভা ক্যাম্পে জন্ম। প্রায় ২০ বছর আগে ময়মনসিংহ এলাকায় বিয়ে করি। পরে শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া কিছু সম্পদের ওপর বাড়ি করে সেখানেই বসবাস শুরু করি।’

নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে আট-দশ বছর আগেও পায়ের রিকশা চালিয়ে যে আয় করতাম, তা দিয়ে সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিবারের সবাইকে গরুর মাংস খাওয়াতে পারতাম। হঠাৎ একসময় গরুর মাংসের দাম বাড়তে শুরু করল। এরপর থেকে কোরবানির ঈদ ছাড়া গরুর মাংস খাওয়া প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে।’

বর্তমানে মাসে এক-দুবার ব্রয়লার মুরগি কিনলেও সেটিও এখন আগের মতো সহজলভ্য নয় বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘মুরগির দামও বেড়ে গেছে। মাছের বাজারের সঙ্গে তো পাল্লাই দেওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে পাঙাশ আর তেলাপিয়া মাছের ওপরই নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এসব মাছের দামও কয়েকগুণ বেড়েছে।’

আগের বাজারের স্মৃতি মনে করে ইরফান বলেন, ‘আগে ১০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে ব্যাগভর্তি সবজি, মাছসহ অনেক কিছু কিনে বাড়ি ফিরতে পারতাম। এখন সেই ঘটনা কল্পনার মতো মনে হয়। ৮০-১০০ টাকার নিচে ভালোভাবে সবজি কেনাই যায় না। বাজারে যেতেই ভয় লাগে।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কোনো রকম জীবনের তাগিদে খেয়ে বেঁচে আছি। ৪৫ বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছি। বাজারের এমন পরিস্থিতি জীবনে কখনো দেখিনি।’

ইরফানের মতো আরও কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের হতাশার কথা জানা যায়। তাদের অভিযোগ, আয় যেখানে প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে, সেখানে প্রতিনিয়ত বাড়ছে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ফলে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ইয়াকুব মিয়া নামে আরেক রিকশাচালক বলেন, ‘ছোটবেলায় ১০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে ব্যাগভর্তি মাছ, মাংস আর সবজি নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। তখনকার দাম আর এখনকার দামের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত।’

তিনি বলেন, ‘এখন যেভাবে প্রতিদিন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের পেটে লাথি মেরে সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

সন্তানদের ভালো খাবার দিতে না পারার কষ্টের কথাও জানান ইয়াকুব। তিনি বলেন, ‘আমরা চাইলেও সন্তানদের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে পারি না। তারা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের কথা কেউ চিন্তা করে না।’

সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কয়েকগুণ বাড়ে, এতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু আমাদের জন্য বাজারে মাছ-মাংসের দাম কমানোর ব্যবস্থা করা হোক, যাতে অন্তত সন্তানদের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে পারি।’

বাজারে আসা নিম্নআয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্ট—নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে অনেক পরিবার তাদের খাদ্যাভ্যাসে কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে। মাছ-মাংসের বদলে সবজি, পছন্দের খাবারের বদলে কম দামের বিকল্প—এভাবেই চলছে অনেক শ্রমজীবী পরিবারের সংসার।

তাদের প্রত্যাশা, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা হবে এবং নিম্নআয়ের মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এমএম