বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে জুলাইয়ে নিহত ব্যক্তিদের কবর জিয়ারত শেষে জুলাই আন্দোলনে হাত হারানো আতিকুল ইসলাম আতিক, আহত নেয়ামত উল্লাহ আল হাদীসহ কয়েকজন।
তাদের বক্তব্য, গণহত্যায় জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে পুনর্বাসন, আহতদের কর্মসংস্থান এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবিও জানান তারা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরার রাজলক্ষ্মী সিনেমা হল এলাকায় আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে আহত হন আতিকুল ইসলাম আতিক। তখন তিনি নায়ক রাজ রাজ্জাকের মার্কেটে একটি ফ্যাশন হাউসে চাকরি করতেন। হাত হারানোর পর তিনি এখন বেকার। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অভাবের সংসার ও ছয় ভাইবোনের মধ্যে বেড়ে ওঠায় আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। বর্তমানে তিনি জুলাই ওয়ারিয়র্সের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠনটি জাতীয় নাগরিক পার্টির অঙ্গসংগঠন হিসেবে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে। বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে উত্তরায় বসবাস করছেন।
আতিকুল বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল তাদের একটি পরিকল্পনা আছে। আমরা ভেবেছিলাম, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে। কিন্তু এখন স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল, তার মূল উদ্দেশ্য যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে নির্মূল করা। সেটা আমাদের জানা ছিল না। আমরা দেখেছি, তারেক রহমান রংপুরের একটি পথসভায় গিয়ে বলেছিলেন, সবাই যেন গণভোটের পক্ষে ভোট দেয়। গণভোটের পক্ষে ভোট দিলে জুলাইয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সরকার গঠনের পর গণভোটের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এটি কখনো হতে দেব না। প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলন করে হলেও এটি বাস্তবায়ন করব।
তিনি আরও বলেন, আমরা দেখেছি সংসদে প্রায় সব সংসদ সদস্যই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলেছিলেন। গণভোট বাস্তবায়ন না হলেও অন্তত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেটি নিয়েও নানা টালবাহানা চলছে। এমনকি জুলাই জাদুঘর নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করা হচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই জুলাই জাদুঘর খুলে দিতে হবে। একই সঙ্গে যেকোনো উপায়ে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিচার প্রসঙ্গে আতিকুল বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে আমাদের ১,৬০০ ভাই-বোন প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু সেই ফ্যাসিস্ট হাসিনার কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর এখনো বিচার হয়নি। সম্প্রতি একজনের রায় হয়েছে, কিন্তু সেটিও হাস্যকর। একজনের নির্দেশে ছয়জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অথচ তার সাজা হয়েছে মাত্র ১০ বছর। তার সর্বনিম্ন শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল। তাই বিচার প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখে ওই রায় বাতিল করে নতুন রায় দেওয়ার দাবি জানাই।
আহত জুলাই যোদ্ধা নেয়ামত উল্লাহ আল হাদী জুলাইয়ের উত্তাল সময়ে মিরপুর-১০ এলাকায় পুলিশের গুলিতে আহত হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছেন। জুলাইয়ে নিহতদের কবর জিয়ারত করতে এসে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবারকে পুনর্বাসন করতে হবে। আমরা দাবি করছি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের যেসব সদস্য সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সরকারের কাছে দাবি জানাই, পুলিশ প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত এসব সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনুক।
নেয়ামত উল্লাহর সঙ্গে আসা আরেক জুলাই যোদ্ধা আশরাফুল বলেন, দুই বছরেও গণহত্যায় জড়িত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসী এবং পুলিশের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের আইনের আওতায় আনা যায়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে এই সরকার আদৌ বিচার করবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের প্রতি আহ্বান, দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে বিচার সম্পন্ন করুন এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করুন, যাতে শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ন্যায়বিচারের অনুভূতি ফিরে আসে।
এর আগে সকালে রায়েরবাজার কবরস্থানে জুলাইয়ের অজ্ঞাত শহীদদের কবর জিয়ারত করেন এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম, দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী, যুবদল থেকে এনসিপিতে যোগ দেওয়া নেতা ইসাহাক সরকারসহ দলের অন্যান্য নেতাকর্মীরা।
এস