বেলা ৩টা থেকে বাজেট উপস্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রথম বাজেট। কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই অধিবেশন ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে এবং বাজেট নিয়ে মোট ৪০ ঘণ্টা আলোচনা হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে গত মে মাসে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা ও বিনিয়োগে চলছে মন্দা—এমন বাস্তবতায় সরকারের সামনে জনতুষ্টিমূলক বাজেট ঘোষণার কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই কঠিনেরে ভালোবেসেই আজ ঘোষিত হতে যাচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট।
ঠিক দুই দশক আগে ২০০৬ সালের জুনে বাজেট দিয়েছিলেন মরহুম অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চার দলীয় জোট সরকারের শেষ বাজেট ছিল সেটি। কুড়ি বছরের মাথায় আজ ফের বিএনপি সরকারের হয়ে জাতীয় সংসদে আগামী এক বছরের আয়-ব্যয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম এ বাজেটকে ঘিরে আছে জনপ্রত্যাশার প্রবল চাপ। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১১২ দিনের মাথায় চরম আর্থিক টানাপড়েন ও বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে এ বাজেট উপস্থাপন হতে যাচ্ছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও পলায়নের পর ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এটি হবে দ্বিতীয় জাতীয় বাজেট। আবার অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকারের প্রথম বাজেট এটি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট দিয়েছিল সংসদ ছাড়াই, উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে।
আকারের দিক থেকে এবারের বাজেট প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার। শুধু তাই নয়, বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এবারের বাজেট অতীতের বাজেটগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রম। ৫৫ বছর আগে প্রথম বাজেটের আকার ছিল ৭১৯ কোটি টাকা। উপস্থাপন করেছিলেন প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ টেলিভিশনের ভাষণের মাধ্যমে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পতিত শাসক শেখ হাসিনার শেষ বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার। যদিও ওই বাজেট সংসদে ঘোষণা করা হয়েছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার। পরে সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে আনা হয়। তার আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছির ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার।
তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন ও বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যয়ের বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্যও অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সুখবর থাকছে স্বাস্থ্য খাতের জন্য। এ খাতে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যসেবায় নানামুখী পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সে জন্য বাজেট বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হয়েছে। পরিচালন ও উন্নয়ন মিলিয়ে বাজেটে ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। বিদায়ী অর্থবছরে ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণে ৭ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়াও নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে অর্থ বিভাগ।
নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে প্রাধান্য দিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য নানা খাতে করছাড় রাখা হচ্ছে বাজেটে। আবার খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতার ওপর অগ্রিম কর বসতে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর খরচের বাড়তি চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানা গেছে, খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বা ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে দশমিক ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতি হাজারে দুই টাকা কর দিতে হবে খুচরা ব্যবসায়ীদের। এ কর বছর শেষে করদাতার প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
বাজেটে করপোরেট কর পরিপালন ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করা, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের ব্যবস্থা করা, অতিরিক্ত নিয়মের বেড়াজাল থেকে করদাতাদের রেহাই দেওয়া, ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচ বাড়িয়ে এবং উৎসে কর কর্তন না করার কারণে খরচ অগ্রাহ্য করার বিদ্যমান বিধান বিলোপ করার মাধ্যমে করদাতার করযোগ্য আয় কমানো এবং করদায় কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সেই সঙ্গে, অডিটের জন্য কর মামলা নির্বাচন এবং উৎসে কর যাচাইয়ের জন্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও অটোমেটেড করার ওপর জোর দেওয়া হবে। নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট হারে করারোপের নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে বিদ্যমান করপোরেট কর হার আগামী কর বছরে অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে করের আওতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কর আদায় করার কথা বলা হচ্ছে বাজেটে।
কয়েক বছর ধরে রাজস্ব আদায়ে বিশাল অংকের ঘাটতি হচ্ছে। এনবিআরের শুল্ক-কর আদায় পরিস্থিতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। ফলে সরকারকে ধারদেনা করে বাজেটের অর্থ জোগান দিতে হচ্ছে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬-৭ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল অর্থাৎ ১০ মাসে ৬৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। এই সময়ে সব মিলিয়ে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এমন হতাশাজনক চিত্র সত্ত্বেও এক লাখ কোটি টাকা বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর বিভিন্ন ক্ষেত্রে শুল্ক-কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে পৌনে চার লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। পরের দুই বছর করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা থাকবে—এমন ঘোষণাও থাকবে। ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমার একটি রূপরেখা দেওয়া হচ্ছে বাজেট বক্তৃতায়। সাধারণ করদাতাদের পাশাপাশি নারী করদাতা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সি করদাতা, তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা, গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা করদাতা, গেজেটভুক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর আহত জুলাই যোদ্ধা করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের প্রত্যেক সন্তান বা পোষ্যের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমাও বাড়ছে।
আগামী অর্থবছর থেকে বছরজুড়েই রিটার্ন দেওয়া যাবে, বাজেটে এমন ঘোষণা আসছে। তাতে বছরের শুরুতে রিটার্ন দিলে থাকবে কর ছাড়ের সুবিধা। আর দেরিতে রিটার্ন দিলে তার জন্য ৫ হাজার টাকা বা প্রদেয় করের ১০ শতাংশ জরিমানা আরোপের বিধান থাকতে পারে। এ ছাড়া ১৫০ সিসির ইঞ্জিন ক্ষমতার বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক হচ্ছে।
ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হচ্ছে আগামী অর্থবছর থেকে। তবে কিছু করদাতার বেলায় এ ক্ষেত্রে ছাড়ও থাকতে পারে। যেমন শিক্ষার্থী, সরকারি ভাতাভোগী, পেনশন সুবিধাভোগী। বর্তমানে ব্যাংক আমানতের মুনাফার টাকা তোলার সময় টিআইএন থাকলে ছাড় পাওয়া যায়।
রপ্তানির প্রণোদনার অর্থের ওপর বর্তমানে বিভিন্ন হারে উৎসে কর কাটা হয়। আগামী অর্থবছরে ১০ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের সুদের বিপরীতে ২০ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে। এতদিন এই উৎসে কর মওকুফ ছিল। আগামী অর্থবছর থেকে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের সময় উৎসে কর বসবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় করমুক্ত রাখার ঘোষণা আসছে আজ ঘোষিত বাজেটে। বর্তমানে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। এছাড়া ফ্রিল্যান্সারদের আয়ও করমুক্ত রাখা হচ্ছে। বিদেশ থেকে আসা কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের আয়কে প্রবাসী আয়ের স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে বাজেটে। সেটি হলে প্রবাসী আয়ের বিপরীতে প্রণোদনাও পাবেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সাররা। এছাড়া স্টার্টআপ, ইনোভেশন ভেঞ্চার ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে কর অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখা হবে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির ক্ষেত্রে সার্বিক শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব থাকছে বাজেটে। বর্তমানে ইভির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর ভার ৯৩ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভিতে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ শুল্ক-কর হারের প্রস্তাব করার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের সময় অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়। সেটিও কমানোর উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। এছাড়া ১৮০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতার ব্যান্ড নিউ হাইব্রিড গাড়ি আমদানির নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে বাজেট প্রস্তাবনায়।
কৃষি ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বর্তমানে করদাতাদের ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ কিংবা ১ শতাংশ হারে উৎসে কর পরিশোধ করতে হয়। নতুন বাজেটে বিদ্যমান এসব করহার কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেল।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ খাতে বড় ধরনের কর সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে উৎপাদন ও সরবরাহে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্জিত আয়ের ওপর আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের টার্নওভার করের ক্ষেত্রে করমুক্ত সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশীয় কোম্পানির জন্য ভোজ্যতেল উৎপাদনে কর অব্যাহতি সুবিধা মিলবে প্রথম ১০ বছর। মুঠোফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম, সিসিটিভি ক্যামেরা দেশীয়ভাবে উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা পাবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর খাতের কাঁচামাল ও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি মিলবে যথাক্রমে ২০৩১ ও ২০৩০ সাল পর্যন্ত।
আজ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা এবং আগামী ১ জুলাই বাস্তবায়ন হলে আমদানি ও স্থানীয়—দুই পর্যায়ে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, অগ্রিম কর, ভ্যাট, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমানোর ফলে কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে। আবার কিছু পণ্যের দাম বাড়তেও পারে। যেমন ক্যাশলেস লেনদেনে উৎসাহিত করতে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পিওএসের দাম কমতে পারে। এসি ও ফ্রিজের উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে এসি-ফ্রিজের দামও কমতে পারে। আবার মুঠোফোন উৎপাদনে ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এতে দেশে উৎপাদিত মুঠোফোনের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। মৃতদেহ সংরক্ষণে মরচুয়ারি আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।
আর বাজেটের করসংক্রান্ত নানা পরিবর্তনের কারণে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। যেমন সিগারেট, বিড়িসহ তামাকপণ্যের মূল্যস্তর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। এতে সিগারেটের দামও বাড়বে, যা বিভিন্ন মহল থেকে দাবি তোলা হয়েছে।
স্থানীয় উৎপাদকদের উৎসাহিত করতে আমদানি করা কাজুবাদামের ওপর আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। আবার রডের ওপর ভ্যাট ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঋণনির্ভরতা বাড়ছে: বাজেট-ঘাটতি মেটাতে আগামী বাজেটেও ব্যাংকঋণের ওপরই বেশি ভরসা রাখছে সরকার। মেগা-সাইজের বাজেটের ব্যয় নির্বাহে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা হচ্ছে বলে জানা গেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে নিট ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল সরকারের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই, অর্থাৎ জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থবছর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরেও ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশাল ঘাটতি: জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি হবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংক খাত থেকে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে।
বেতনস্কেল বাস্তবায়নে ৩৫ হাজার কোটি: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন কমিশনের সুপারিশ করা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। বাকি ৫০ শতাংশ পাবেন পরের অর্থবছরে। তার পরের অর্থবছরে পাবেন বিভিন্ন ভাতা, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বেতন-ভাতা সবই পাবেন সরকারি কর্মচারীরা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। নতুন বেতন কমিশন সুপারিশ করেছিল, আগামী অর্থবছরের সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি বেতন-ভাতার জন্য বাড়তি লাগবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের সুপারিশ আগামী অর্থবছরে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা দিতেই ব্যয় হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এ কারণে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নিয়েছে সরকার।