মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বিদেশ-নির্ভরতা পেরিয়ে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় উপস্থাপিত গবেষণায় এসব উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল মূল গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বিশ্বব্যাপী ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা কমার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত মূল্যে রেকর্ড ২৩ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডি বন্ধ হওয়া এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা বাজেট ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত এই সংকটকে সাময়িক কোনো ঘটনা না বানিয়ে একটি গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নির্দেশ করছে।

যদিও আগে অনুমোদিত পুরোনো প্রকল্পগুলোর অর্থ ছাড় হওয়ার কারণে (২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা ছাড়) বাংলাদেশে এই পতনের প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি, তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের গতি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এনজিও খাতে ২ হাজার ৬১টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১,৬৫৪টিতে নেমে এসেছে। ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের ওপর চালানো জরিপ অনুযায়ী, অনুদাননির্ভর সেবাধর্মী এনজিওগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে; যেখানে নিজস্ব আয় বা ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহকারী এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে মাত্র ১২ শতাংশ।

অর্থায়নের ঘাটতি মেটাতে বিআইডিএসের গবেষণায় চারটি বিকল্প উৎসের কথা তুলে ধরা হয়েছে—সরকারি বাজেট ও প্রকল্পে এনজিওকে যুক্ত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল, সামাজিক ব্যবসা এবং নতুন অর্থনৈতিক উদ্ভাবন। তবে সিএসআর খাতের আকার সীমিত হয়ে আসায় (২০২৫ সালে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪৫ কোটি টাকায়) এবং নতুন আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ছোট এনজিওগুলোর প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকায়, সবচেয়ে কার্যকরী সমাধান হতে পারে সরকারি প্রকল্পে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো। এর জন্য সরকারি ক্য ক্রয়বিধির আওতায় এনজিওগুলোর জন্য একটি উন্মুক্ত তালিকা প্রস্তুতকরণ এবং সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন নির্দেশিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব নীতিকাঠামো তৈরির তাগিদ দেন। তিনি বলেন, "দেশের প্রয়োজন ও সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে। এতে সরকারি সেবার কার্যকারিতা বাড়ার পাশাপাশি এনজিওগুলোর জন্য টেকসই বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।"

গবেষকদের মতে, পুরোনো প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকারি ক্রয়, পিকেএসএফ ও এনজিও ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল গঠন এবং সামাজিক ব্যবসাকে আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দিয়ে এনজিও খাতের একটি নতুন ও আত্মনির্ভরশীল অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

এমএম