বুধবার (২১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক ফোরাম আয়োজিত “শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান” শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বলেন।
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক ফোরামের সভাপতি এরশাদ হাসানের সভাপতিত্বে ও মঈনুল ইসলামের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন জাসাসের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রোকন, বিএফইউজের সাংগঠনিক সম্পাদক এরফানুল হক নাহিদ, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির সভাপতি কামরুল হাসান দর্পণ, অভিনেতা কবির আহমেদ, ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, খন্দকার আতিক, রবিউল আহমেদ, নাট্যপরিচালক সাজ্জাদ হোসেন দোদুল, নাট্যপরিচালক মুজিবুর রহমান মুজিব, সাংবাদিক এইচ এম আল আমিন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সংস্কৃতি একটি সমাজের প্রাণ। এটি মানুষের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। একটি জাতি কতটা সভ্য বা উন্নত, তার পরিমাপ দেয় সংস্কৃতি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন—সমাজের অন্ধকার ঘুচাতে ও অন্যায়-অপরাধ নির্মূল করতে হলে সাংস্কৃতিক জাগরণ প্রয়োজন। এই জাগরণের মধ্য দিয়ে তিনি সব অনিয়ম, অন্যায় ও নৈরাজ্য চিরতরে রুখে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই জাগরণের মধ্য দিয়ে অনাবিষ্কৃত সভ্যতার নিদর্শনগুলো জাতীয় সম্পদ হিসেবে পরিচিতি পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে, বিশেষ করে পর্যটন খাতে, অপার সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। তাই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই একটি সাংস্কৃতিক জাগরণের উদ্যোগ নেন।
এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর নতুন রাজনৈতিক দর্শন উপস্থাপন করেন। এই জাতীয়তাবাদে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও সংস্কৃতিনির্বিশেষে সব নাগরিকের ঐক্য ও সংহতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের সংস্কৃতি আমাদের দেশজ কৃষ্টির ধারক ও বাহক এবং এর রয়েছে এক অনন্যসাধারণ ঐতিহ্য।
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতি-ধর্ম-ভাষা ও বর্ণের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা প্রবর্তন করেন। এর ভিত্তি ছিল—রাষ্ট্রের সীমারেখার ভেতরে বসবাসরত সব ধর্ম, ভাষা ও বর্ণের মানুষ মিলে জাতিরাষ্ট্র। এর ফলে ধর্ম, ভাষা ও বর্ণের ভিত্তিতে কেউ বাদ পড়েনি; সবাই একটি কমন প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পায়।
রাষ্ট্রচিন্তক জিয়া দেখেছিলেন, বিশ্বের কোনো দেশই একক কোনো ধর্ম, ভাষাভাষী অথবা একক কোনো বর্ণের মানুষের নয়। হিটলার বর্ণের ভিত্তিতে জার্মানি গড়তে গিয়ে ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরতা সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েল ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে গিয়ে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর আগ্রাসন চালাচ্ছে। অন্যদিকে বহুভাষা, বহুধর্ম ও বহুবর্ণের মানুষ নিয়ে ভূখণ্ডকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ কায়েম করায় যুক্তরাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের জন্য অন্যতম সেরা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। যেখানে এককেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, সেখানে ভূখণ্ডকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ সবাইকে এক ছাদের নিচে আনতে সক্ষম।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান উদারতন্ত্রের ভাবধারা উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দর্শন—এটি ধর্মান্ধও নয়, আবার ধর্মহীনও নয়। সব ধর্ম, ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের স্বীকৃতি রয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে। ফলে একটি সুস্পষ্ট চেতনার মাধ্যমে সব ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় সত্যিকারের উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি।
‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে’ সন্নিবেশিত আছে সব জাতির পরিচয়, সব ধর্মের পরিচয়, সব ভাষার পরিচয়, সব সংস্কৃতির পরিচয় এবং ভৌগোলিক পরিচয়—সর্বোপরি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সম্পদের সমবণ্টন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। এককথায় সুশৃঙ্খল মধ্যপন্থী জাতি গঠনের সব উপাদানই এতে বিদ্যমান।
একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) প্রতিষ্ঠা করেন।
সাংবাদিক নেতাটি বলেন, শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি জিয়াউর রহমানের গভীর অনুরাগ ছিল। ১৯৭৬ সালে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রথমবারের মতো ‘একুশে পদক’ প্রবর্তন করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রবর্তন করেন। ১৯৭৯ সালের ৯ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ১৯৭৭’ প্রদান করা হয়।
এ ছাড়া তাঁর আগ্রহে ১৯৮১ সালের মার্চ-এপ্রিলে ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা একাডেমির উন্নয়নে তাঁর আমলে ‘বাংলা একাডেমি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮’ জারি করা হয়। শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৭ সালের ১৫ জুলাই পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের পশ্চিম পাশে শিশু একাডেমির নতুন ভবনের উদ্বোধন করেন।
তিনি ১৯৭৮ সালে চালু করেন ‘জাতীয় শিশু পুরস্কার’ প্রতিযোগিতা এবং ১৯৭৯ সালে শিশুদের বিনোদনের জন্য শাহবাগে ‘জাতীয় শিশু পার্ক’ স্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে ধ্বংস করা হয়। ১৯৭৬ সালে টেলিভিশনে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতার সূচনা হয় তাঁর উদ্যোগে।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণে তিনি রাঙামাটিতে ‘উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট’ এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে ‘উপজাতীয় কালচারাল অ্যাকাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন। চারটি বিভাগীয় শহরে ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করেন।
তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে চলচ্চিত্র নগরী, ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অব্যাহত রাখেন এবং গণমাধ্যম বিকাশে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) প্রতিষ্ঠা করেন।
জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন আগ্রাসনমুক্ত নিজস্ব সংস্কৃতির উত্থান। সেই লক্ষ্যেই তিনি শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের সম্মানিত করেছেন এবং নতুন প্রতিভা অন্বেষণে কাজ করেছেন।
শেষে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, জিয়া নেই—তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছেন তারেক রহমান। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা তাঁর নেতৃত্বে পূরণ হবে—এই প্রত্যাশা আমরা রাখি।
এনএইচ