logo
Search

জাতীয়

সংসদে তীব্র বিতর্ক

সার আছে গুদামে, কৃষক ছুটছেন কালোবাজারে!

দেশে সার নিয়ে কোনো ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুত রয়েছে- সরকারের এমন দাবির বিপরীতে কৃষকরা সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল। তাদের দাবি, কৃষকদের কালোবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়েছে যে কোথাও কোথাও কৃষকরা গুদাম লুট করতেও বাধ্য হয়েছেন। এমনকি বিজিবি মোতায়েন করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও সারের জন্য কৃষকদের এই দুর্ভোগের দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।

টাইমনিউজবিডি ডেস্ক

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ‘দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটে সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন সংসদ সদস্যরা। জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান আলোচনাটি উত্থাপন করেন।

আলোচনায় নাজিবুর রহমান বলেন, দেশে চলমান সার সংকট মূলত সারের মজুতের সমস্যা নয়। সরকারের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভর্তুকির সার মিয়ানমারে পাচার হয়ে তার বিনিময়ে দেশে ইয়াবা আসছে—এমন খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এটি দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে।

জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংকট শুরু হওয়ার পর সরকার প্রথমে দেশে কোথাও লোডশেডিং নেই বলে দাবি করেছিল। পরে তারাই জানিয়েছে, জ্বালানি সংকট নিয়ে দিন গোনা ছাড়া আর কিছু করার নেই। এখন সারের মজুত নিয়ে সরকারের বক্তব্য বিশ্বাস করবেন, নাকি অবিশ্বাস করবেন—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

নাজিবুর রহমান বলেন, সরকারের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা মূলত ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। সার কারখানা বন্ধ রেখে জনগণের অর্থে বেশি দামে সার কেনা হচ্ছে, আবার বলা হচ্ছে দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। অথচ সেই সার কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। এটিই সরকারের চরম ব্যর্থতা।

নতুন ডিলার নিয়োগেরও সমালোচনা করেন তিনি। নাজিবুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলের ডিলারদের বাদ দেওয়া ঠিক আছে। কিন্তু লাখ লাখ টাকা নিয়ে নতুন করে যেসব দলীয় লোককে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তাদের মাধ্যমে কোনো দুর্নীতি হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।

জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সার মজুত রয়েছে। তার দাবি, বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররাই সরকারকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।

তিনি জানান, সংকট মোকাবিলায় সারা দেশে নতুন করে প্রায় পাঁচ হাজার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এসব ডিলারের অধীনে আরও ১৬ হাজার খুচরা ডিলার নিয়োগ করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ৩ হাজার ৭৫৯ জন সার ডিলার বর্তমানে পলাতক। ফলে এসব ডিলার পয়েন্ট শূন্য রয়েছে। সারের সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা সচল রাখতে নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় কমবেশি ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রত্যেক ডিলার আবার দুটি করে খুচরা ডিলার নিয়োগ করতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সারের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারে সার পাচারের কিছু তথ্য প্রশাসনের হাতে এসেছে।

সার মনিটরিং কমিটিতে সংসদ সদস্যদের না রাখার বিষয়ে বিরোধী দলের ক্ষোভের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার বিতরণের দায়িত্ব সংসদ সদস্যরা নিতে চান না, ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরাও নিতে চান না। তাই সার বিতরণের দায়িত্ব নিয়ম অনুযায়ী ডিলারদেরই পালন করতে হবে।

জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সরকার বলছে দেশে সারের জোয়ার বইছে। অথচ কৃষকদের ন্যায্যমূল্যের চেয়ে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে ছয়টিই বন্ধ রয়েছে। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোডাউন সারে ভর্তি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, ভর্তুকির সার মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর বিনিময়ে দেশে আইস ও ইয়াবার মতো ভয়ংকর মাদক ঢুকছে।

ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বর্তমানে ডিলার নিয়োগে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। গত ১৭ বছর ধরে সক্রিয় একটি চক্রের সঙ্গে মিলে কোনো কোনো ডিলার নিজের নামে, স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়ের নামেও ডিলারশিপ নিচ্ছেন। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

তিনি বলেন, দুর্নীতি ও দলীয়করণ ওপর থেকে নির্মূল করা না গেলে শুধু গাছের পাতা ছিঁড়ে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

এদিকে সার সংকটের কারণে আগামী রবি ও বোরো মৌসুমে দেশ গুরুতর খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মো. মাহবুবুল আলম।

তিনি বলেন, কালোবাজারি বন্ধ করা, ডিলারদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং কৃষকের ঘরে ঘরে সার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

এনএইচ