শনিবার (১৩ জুন) সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মে মাসজুড়ে সংঘটিত ৬১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১,৬৫২ জন।

একই সময়ে রেলপথে ৪২টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ও ২৯ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে নৌপথে ২১টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন, ১৫ জন আহত হয়েছেন এবং সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন।

সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৬৭৬টি দুর্ঘটনায় মোট ৬৭১ জন নিহত এবং ১,৬৯৬ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মে মাসে ২২১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৩১ জন নিহত ও ২১৯ জন আহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ০৫ শতাংশই মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। নিহতদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং আহতদের মধ্যে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৮০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৮৫ জন নিহত ও ৫৫৮ জন আহত হয়েছেন। বিপরীতে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, যেখানে ২৭টি দুর্ঘটনায় ৩৮ জন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের পর্যবেক্ষণে গণমাধ্যম থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। সংগঠনটির মতে, প্রকৃত হতাহত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ সব দুর্ঘটনার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় না।

দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে ছয়জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১৩৯ জন চালক, ১২১ জন পথচারী, ১১৩ জন পরিবহন শ্রমিক, ৯৬ জন শিক্ষার্থী, আটজন শিক্ষক, ৯৩ জন নারী, ৬৮ জন শিশু, দুজন চিকিৎসক, তিনজন সাংবাদিক, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন আইনজীবী এবং তিনজন রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দুইজন পুলিশ সদস্য, দুইজন বিজিবি সদস্য, একজন চিকিৎসক, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৩৬ জন চালক, ১১০ জন পথচারী, ৬৯ জন নারী, ৫৯ জন শিশু, ৭৩ জন শিক্ষার্থী, ৪৯ জন পরিবহন শ্রমিক, আটজন শিক্ষক, একজন আইনজীবী এবং তিনজন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী।

এ সময় দুর্ঘটনায় জড়িত ৯৭৫টি যানবাহনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান ও লরি, ১৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ বাস, ১২ দশমিক ৯৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ নছিমন, করিমন, মাহিন্দ্রা, ট্রাক্টর ও লেগুনা এবং ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ কার, জিপ ও মাইক্রোবাস।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ঘটনার ৩২ দশমিক ৩০ শতাংশ ছিল চাপা দেওয়া বা ধাক্কার ঘটনা। ৪২ দশমিক ০৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে, ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ বিভিন্ন অন্যান্য কারণে, শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ ওড়না চাকায় পেঁচিয়ে এবং ০ দশমিক ৮১ শতাংশ ট্রেন ও যানবাহনের সংঘর্ষে।

সড়কের ধরন অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ দশমিক ৬৬ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ১৮ দশমিক ১০ শতাংশ ফিডার রোডে ঘটেছে। এছাড়া ৫ দশমিক ২২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ রেলক্রসিং এলাকায় সংঘটিত হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো—

১. জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল।

২. রোড সাইন, রোড মার্কিং ও সড়কবাতির অভাবে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন মহাসড়কে উঠে আসা।

৩. মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডারের অভাব এবং গাছপালার কারণে অন্ধ বাঁক সৃষ্টি হওয়া।

৪. সড়ক নির্মাণের ত্রুটি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি ও ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা।

৫. উল্টো পথে যান চলাচল, সড়কে চাঁদাবাজি এবং পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন।

৬. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অতিরিক্ত যাত্রী বহন।

৭. বেপরোয়া গতিতে এবং দীর্ঘ সময় বিরামহীনভাবে যানবাহন চালানো।

৮. বৃষ্টির কারণে সড়কে গর্ত সৃষ্টি ও ভাঙাচোরা সড়ক।

৯. অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের বাস, ট্রাক বা পণ্যবাহী যানবাহনের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশ

১. ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

২. উন্নত দেশের আদলে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

৩. প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

৪. চালকদের আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা ও লাইসেন্সপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

৫. গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ।

৬. কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা।

৭. পথচারী পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন।

৮. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত রোড সেফটি অডিট পরিচালনা।

৯. যানবাহনের ফিটনেস প্রদান প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন অপসারণ।

১০. নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠা।

১১. পরিবহন খাত পরিচালনায় মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

এনএইচ