কূটনৈতিক রিপোর্টার॥ অর্ন্তবর্তী সরকার প্রধান ড. মোহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২১ সেপ্টেম্বর রাত চারটায় বিশেষ বিমানে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্য ঢাকা ত্যাগ করবেন। এই প্রথম সরকার প্রধানের সঙ্গে সাত উপদেষ্ঠাসহ চার রাজনীতিবিদ সফরসঙ্গী হিসেবে সেখানে যাচ্ছেন।বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার নিউইয়র্ক সফরের বিস্তারিত জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ২১ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে দেশ ছাড়বেন প্রধান উপদেষ্টা। ২২ সেপ্টেম্বর তিনি নিউইয়র্কে পৌঁছাবেন। ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘের মূল অধিবেশেনে ভাষণ দেবেন। অধিবেশন শেস করে আগামী ২ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এ বছরের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির সভাপতিত্বে ‘হাই লেভেল কনফারেন্স অন দ্য সিচুয়েশন অব রোহিঙ্গা মুসলিমস অ্যান্ড আদার মাইনোরিটিস ইন মিয়ানমার’ শীর্ষক একটি উচ্চ পর্যায়ের সভা হবে। রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এমন একটি উচ্চ পর্যায়ের সভার আয়োজন এবারই প্রথম। এই উচ্চ পর্যায়ের সভা থেকে যেন রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানের একটি কার্যকর পরিকল্পনা উঠে আসে, সে জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদার ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে গত মাসে কক্সবাজারে একটি অংশীদার সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ প্রমুখ।সরকারী খরচে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে সরকারের সঙ্গে চার সদস্যের রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিবেন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির চার নেতা। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং এনসিপির সদস্য সচিব আক্তার হোসেনকে সাথে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে দিবেন।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, জাতিসংঘের তিনটি মূল স্তম্ভ- শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার সবই সমানভাবে এবারের অধিবেশনে গুরুত্ব পাবে। বিশ্বব্যাপী আস্থার সংকট, সংরক্ষণবাদের উত্থান, বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং আলোচনার পথ উপেক্ষা করার ফলে সৃষ্ট যে তীব্র সংকট থেকে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটছে, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির পাশাপাশি উদ্ভূত নানারকম বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপের বিষয়ে সার্বিক আলোচনার ক্ষেত্রে এবারের প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত অর্থবহ।

তিনি বলেন, এবছরের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। রোহিঙ্গা সঙ্কটকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ কর্তৃক সাধারণ পরিষদে এমন একটি উচ্চ-পর্যায়ের সভার আয়োজন এবারই প্রথম।

উল্লেখ্য যে, গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা প্রথম বারের মত সকল অংশীদারের অংশগ্রহণে জাতিসংঘ কর্তৃক এমন একটি উচ্চ-পর্যায়ের সভা আয়োজনের প্রস্তাব করেন। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার এই প্রস্তাব দ্রুত বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ সর্বসম্মতিক্রমে একটি রেজ্যুলুশনের মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির নেতৃত্বে উক্ত উচ্চ পর্যায়ের সভাটি আয়োজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই উচ্চ-পর্যায়ের সভা থেকে যেন রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধানের একটি কার্যকর ও সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা উঠে আসে তার জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদার ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের কাজ করছে সরকার।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন আরও বলেন, প্রথমবারের মত এ বিষয়ে জাতিসংঘের উচ্চ-পর্যায়ের সভার আয়োজন এবং স্বয়ং জাতিসংঘ মহাসচিব-এর সফর তারই প্রমাণ। আমরা এ উচ্চ-পর্যায়ের সভার সফল অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

তিনি বলেন,বাংলাদেশ সরকারের চলমান নানামুখী সংস্কার কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত থেকে অন্যতম অনুঘটক হিসেবেও দেশের তরূণ সমাজ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মানের প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্ব যুব কর্মসূচীর ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত উচ্চ-পর্যায়ের সভায় অংশগ্রহণ করে আমরা আমাদের তরূণ ও যুব সমাজের আশা-আকাংক্ষা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারব। ভবিষ্যৎ বিশ্বের পরিকল্পনা যেন আমাদের তরুণ সমাজের চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, সেজন্য বিশ্বমঞ্চে এই সংক্রান্ত আলোচনায় আমাদের উচ্চ-পর্যায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি । অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২৬ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ আলোচনা পর্বে বক্তব্য রাখবেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আশা-আকাংক্ষার প্রেক্ষিতে বিগত এক বছরে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সংস্কার ও আগামী দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় বিশ্বদরবারে তুলে ধরবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ অবস্থান, বিশ্বব্যাপী সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিকূলতা, উন্নয়নশীল দেশসমূহ হতে সম্পদ পাচার প্রতিরোধ, নিরাপদ অভিবাসন, অভিবাসীদের মৌলিক পরিষেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, জেনারেটিভ কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির টেকসই হস্তান্তর, এবং সর্বোপরি ফিলিস্তিন ও ইসরাইল-এর যুদ্ধ বিরতি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস তাঁর বক্তব্যে উঠে আসবে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের স্বাগত অভ্যর্থনা, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির জনাব ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যর্থনাসহ এ সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের এবারের অগ্রাধিকার ইস্যুগুলোর প্রত্যকটিই বাংলাদেশের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ইস্যুগুলোর উপর যেসব ইভেন্ট আছে, বাংলাদেশ তার সব কয়টিতেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে বলে আশা করছি । বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে মনে করে। সার্বিক বিবেচনায় এবারের অধিবেশনে মাননীয় উপদেষ্টার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত ও সুদৃঢ় করবে।