এই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দেশের তরুণ প্রজন্ম। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ একসময় সবাই একই দাবিতে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, বৈষম্য, দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরিত হয়েছিল। সেই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি।

তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য কেবল ক্ষমতার পালাবদলে নয়; তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সেই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তার ওপর। বিপ্লবের উত্তাপ একসময় স্তিমিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা তখনই শুরু হয়।

আজ, সেই ঐতিহাসিক ঘটনার দুই বছর পর দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে যে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, সেই পথে আমরা কতদূর এগোতে পেরেছি?

অস্বীকার করার উপায় নেই, কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের পরিসর আগের তুলনায় প্রসারিত হয়েছে, ভয়ভীতির সংস্কৃতি অনেকটাই দুর্বল হয়েছে, রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগে সংযমের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে এবং গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার এখন জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নাগরিকরাও আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতনভাবে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করছেন। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক লক্ষণ।

কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও কঠিন। রাষ্ট্র সংস্কার কখনো স্লোগানে সম্পন্ন হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং দলীয়করণের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। জনগণের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত ও দৃশ্যমান পরিবর্তন; বাস্তবতা বলছে, সেই পথ এখনও দীর্ঘ, জটিল এবং চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ।

৫ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই রাষ্ট্র কখনো জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। জনগণের সম্মতি ছাড়া ক্ষমতার স্থায়িত্ব হয়তো সাময়িকভাবে সম্ভব, কিন্তু ইতিহাসে তা কখনো স্থায়ী হয়নি। একইভাবে জনগণের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত যে কোনো সরকারকেও মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার বৈধতা আসে জনগণের আস্থা থেকে; আর সেই আস্থা টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হলো স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মত্যাগের স্মৃতি। যারা জীবন দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, যারা স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়; এটি সমগ্র জাতির ইতিহাস ও গৌরবের অংশ। তাঁদের স্মরণ করার প্রকৃত অর্থ কেবল স্মৃতিচারণ নয়, বরং এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করা যেখানে ভবিষ্যতে কোনো নাগরিককে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য জীবন দিতে না হয়।

গণঅভ্যুত্থান কখনো ইতিহাসের শেষ অধ্যায় নয়; বরং নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সেই অধ্যায়ে যদি ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে রাজপথে উচ্চারিত স্বপ্নগুলো অপূর্ণই থেকে যাবে।

তাই ৫ আগস্ট কেবল বিজয়ের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো শাসকই জনগণের ঊর্ধ্বে নন। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দায় থেকেও কোনো সরকার মুক্ত নয়।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের নয়, দায়িত্বশীলদেরই স্মরণ করে। তাই ৫ আগস্টের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা হবে তখনই, যখন ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে জনগণ; যখন ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান হবে শক্তিশালী; যখন ভয় নয়, স্বাধীনতা হবে রাষ্ট্রের পরিচয়; আর যখন ন্যায়, মানবিকতা ও গণতন্ত্র হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক ভিত্তি।

জুলাই-আগস্টের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড়, শাসকের চেয়ে সংবিধান শক্তিশালী, আর রাষ্ট্রের চেয়ে উচ্চকণ্ঠ হবে জনগণের অধিকার।

এনএইচ