সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারস ইনস্টিটিউটে সেন্টার ফর পলিসি এনালাইসিস অ্যান্ড এডভোকেসি (সিইপিএএ) আয়োজিত 'বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন: শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা ও সংস্কারের ভবিষ্যৎ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যারা টপ গ্রেডার-প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়-তারা সাধারণত বিভিন্ন কোম্পানির সিইও হয় কিংবা আমলা হয়। দ্বিতীয় সারির মেধাবীরা উদ্যোক্তা হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য করে। আর যারা ব্যাকবেঞ্চার, তারা রাজনীতি করে এবং বিভিন্ন গ্রুপ পরিচালনা করে।’
আরও পড়ুন: আমার অধীনে বন্দি ছিলেন শেখ হাসিনা: ট্রাইব্যুনালে আমান আযমী
আব্দুল্লাহিল আমান আজমী বলেন, ‘আমাদের দেশের সমস্যা হলো, আমাদের মেধা আছে, আমরা পরিশ্রমী জাতি, আমাদের মধ্যে রেজিলিয়েন্স আছে—সবই আছে। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব, সঠিক দর্শন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা।’
শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নৈতিক শিক্ষার শুরু পরিবার থেকেই হওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ৪৫ বছর শিক্ষকতা করেছি। সামরিক বাহিনীর মূলধারার শিক্ষায় গত ৩০ বছর কাজ করেছি। বিভিন্ন সময়ে আটটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মনে হয়, নৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করে সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা বলেন, শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষা দিয়ে প্রকৃত জ্ঞান তৈরি করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক কিছু মুখস্থ করছি, পরীক্ষায় লিখছি, শিক্ষক খুশি, শিক্ষার্থী খুশি, অভিভাবকও খুশি। কিন্তু জ্ঞান তৈরি হচ্ছে না।’
জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বোঝাতে একটি গল্প তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য এক জ্ঞানীর কাছে গেলে তাকে সমুদ্রের পানিতে মাথা চেপে ধরে রাখা হয়। শ্বাস নেওয়ার জন্য যখন সে অস্থির হয়ে ওঠে, তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে জ্ঞানী ব্যক্তি তাকে বলেন, পানির নিচে থাকার সময় সে যেভাবে প্রাণপণে শ্বাস নিতে চেয়েছিল, জ্ঞানকেও যদি সেভাবে মরিয়া হয়ে খুঁজত, তাহলে জ্ঞান অর্জন করতে পারত।’
আব্দুল্লাহিল আমান আজমী বলেন, ‘জ্ঞান এমন কোনো বিষয় নয় যে মাথা খুলে তার ভেতরে কোনো পাওয়ার ব্যাংক ঢুকিয়ে দিলেই কেউ জ্ঞানী হয়ে যাবে।’
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সুস্পষ্ট ভিশন তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আগামী ৫০ বছর পর দেশের মানুষকে কোথায় দেখতে চান—এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার লক্ষ্য থাকতে হবে।
‘Begin with the end in mind’-এই নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভিশন থাকলেই একটি কার্যকর দিকনির্দেশনা তৈরি করা সম্ভব। দর্শন ও দিকনির্দেশনা ওপর থেকে আসবে, তবে তার বাস্তবায়ন হতে হবে নিচ থেকে।
তিনি বলেন, ‘দর্শন এবং দিকনির্দেশনা আসবে ওপর থেকে টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচে। আর এর বাস্তবায়ন হবে নিচ থেকে, বটম-আপ পদ্ধতিতে। এই বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে।’
আরও পড়ুন: আয়নাঘর ঘুরে এসে যা লিখলেন গোলাম আযমপুত্র আযমী
দেশের অবনমন ঠেকাতে আরও গভীর ও পরিকল্পিত চিন্তার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু সেমিনার, আলোচনা বা কর্মশালা আয়োজন করে সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সিরিয়াস ব্রেনস্টর্মিং ও কার্যকর পরিকল্পনা।
তিনি বলেন, ‘আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেমিনার করছি, জুলাই নিয়ে কথা বলছি, শিক্ষা নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু আমাদের যে অবনমন চলছে, সেটিকে কীভাবে থামানো যায়, সেটি নিয়ে আমাদের আরও সিরিয়াসভাবে চিন্তা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কারা করবে? কীভাবে করবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।’
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আব্দুল্লাহিল আমান আজমী বলেন, সঠিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা না থাকলে দেশ আরও বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমি শুধু দোয়া করি, আল্লাহ আমাদের ভালো নেতা দান করুন, যারা আমাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন, একটি দর্শন দেবেন। আর আমরা আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কিছুটা হলেও দেশকে এগিয়ে নিতে পারব।’
আরও পড়ুন: স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন গোলাম আজমপুত্র আযমী
‘অন্যথায় আমরা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাব। আমরা যখন এই পৃথিবী থেকে চলে যাব, তখন আমাদের সন্তানদের জন্য আরও বিশৃঙ্খল একটি অবস্থা রেখে যাব’, যোগ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব তাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে। আমি জুলাই শহীদদের মাগফেরাত কামনা করি। যারা জুলাইয়ের যুদ্ধে আহত হয়েছেন, যারা এখনো সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আল্লাহ আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন। আমি যেন দেশের জন্য কাজ করতে পারি, এই দোয়া করবেন।’
এমএম