আজ সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলরুমে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) উদ্যোগে "জুলাই বিপ্লব: স্বাস্থ্য খাতের অবদান ও ভবিষ্যৎ করণীয়" শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন

তিনি আরও বলেন, "জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ ও আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার অপরাধে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার চিকিৎসকদের বদলি করেছিল। এমনকি এক বিভাগের চিকিৎসককে অন্য বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই অন্যায় বদলি আদেশ বাতিল করে চিকিৎসকদের পূর্বের অবস্থানে সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার নির্বাচনে আসার পর নেক্কারজনকভাবে কোনো কারণ ছাড়াই পুনরায় চিকিৎসকদের বদলি করা শুরু করেছে।" প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে গণভোটের রায় মেনে 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

গণভোট নিয়ে বর্তমান সরকারের আপত্তির সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার বা কোনো আইনকে একজন সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী চাইলেই অবৈধ বলতে পারেন না। আইনের ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র আদালতের রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনোভাবেই প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারকে অবৈধ বলতে পারেন না।" তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে ছাত্র-জনতা রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, জুলাই বিপ্লবে গুলিবিদ্ধ হয়ে, রক্তাক্ত হয়ে জুলাই যোদ্ধারা যখন ব্যান্ডেজ লাগিয়ে আবারও রাজপথে নেমে আসতো পুলিশ ভয়ে আর আতঙ্কে হাঁপিয়ে উঠতো। তিনি বলেন, আমরা আহতদের আন্দোলনে পেছনে থাকার অনুরোধ করলেও তারা সামনের সারিতে এসে নেতৃত্ব দিতো।

চব্বিশের জুলাইয়ের ভয়াল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের ডকুমেন্টারি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করে আগামী প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিপ্লব পরবর্তী ছাত্র-জনতা বারবার ফ্যাসিস্টের দোসর রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য দাবি জানিয়েছে। কিন্তু বিএনপি সাংবিধানিক সংকটের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখতে ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচন পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়া থেকে বিরত রাখার দাবি জানালেও বিএনপি সরকার সেই দাবি উপেক্ষা করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতিকে পবিত্র সংসদে নিয়ে সংসদকে অসম্মান করেছে।

ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় ৬ মাস পর কেন রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগে বিএনপি বাধ্য করেছে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, কারণ রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে বিএনপির স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেছে। স্বার্থ উদ্ধারের সাথে সাথে রাষ্ট্রপতিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসই হচ্ছে স্বার্থ উদ্ধার হলেই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া এবং ভুলে যাওয়া। যেমনি তারা ভুলে গেছে জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা। জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা সংবিধান সংশোধনী চায়নি, রাষ্ট্রের সংশোধনী চায়নি। ছাত্র-জনতা চেয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সংবিধান সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

ডা. মো. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ এমপি বলেন, জুলাইয়ে আহতদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ নিলেও আমরা অনেক আহত যোদ্ধার শারীরিক ও পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে বিদেশে না পাঠিয়ে সুস্থতার জন্য দেশেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমাদের চিকিৎসকদের সেই প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রের অন্তত ১০০ কোটি টাকা সেভ হয়েছে। আমরা যাদের চিকিৎসা দিয়েছি বিদেশি চিকিৎসক প্যানেল ঐ চিকিৎসাকে বেস্ট এবং যথাযথ বলেছে। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক সমাজ শুধু আহতদের চিকিৎসা দেয়নি বরং রাষ্ট্রের টাকা সেভ করার কাজও করেছে।

চব্বিশের জুলাইয়ের ভয়াল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, সেই সময় খুনি হাসিনার নির্দেশ ছিল "নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ"। কিন্তু ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সদস্য ও দেশপ্রেমিক চিকিৎসকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসিনার সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে আহত, রক্তাক্ত, গুলিবিদ্ধ ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। চিকিৎসা দেওয়ার অপরাধে অনেক ডাক্তারকে আওয়ামী লীগের জুলুমের শিকার হতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আহত অনেকের সাথে আমরা হাসপাতালে যেতে পারিনি কিন্তু চিকিৎসকেরা তাদের সেবা দিয়েছিল। আমরা সমন্বয়কদের জন্য সেফ হোমে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম। সেফ হোমে থাকার ক্ষেত্রেও এনডিএফের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলেরা আমাদেরকে সহযোগিতা করেছিলেন। সেই সময়ে আমরা আব্দুল হান্নান মাসুদ, রিফাত রশিদ, মাহিন সরকার, মুসাদ্দেক আলী তাদের নেতৃত্বে আমরা একটা প্রেস কনফারেন্সের ব্যবস্থা করেছিলাম যে, হাসিনার গণহত্যা ও শিশু হত্যার চিত্র আমরা জাতির সামনে তুলে ধরবো। সেই সময় প্রথম সারির সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফসহ অন্যরা গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ছিলেন। তাদেরকে সেখান থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, এনডিএফের মাধ্যমে আমরা যে তালিকা পেয়েছি সেই তালিকার আলোকে আমরা শহীদদের তালিকা তৈরি করে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছি। জুলাই আন্দোলনে এনডিএফের ভূমিকার জন্য তিনি এনডিএফের সকল সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সহ-সভাপতি ডা. আতিয়ার রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম এমপি, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি ডা. এমজি ফারুক হোসেন, সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন্দ, অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ডা. মাহফুজুর রহমান, মো. জসীম প্রমুখ।

ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ডা. মারুফ শারিয়ারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা. মোহাম্মদ সুজন শরীফ। এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিনসহ জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধা এবং এনডিএফের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।

এস