রোববার জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দলের নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা, মীর কাশেম আলীকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। যারা এই কাজের সঙ্গে যে যেভাবে জড়িত, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক। তাহলে আইনের শাসন কায়েম হবে।

তিনি বলেন, শুধু জামায়াতের এই পাঁচজনকে নয়, আমাদের আরো ৬ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে বিনা চিকিৎসায় জেলখানায় হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাস্সিরে কোরআন মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীও ছিলেন। এভাবে একটি দলের শীর্ষ ১১ নেতাকে হত্যার ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাসে আছে কিনা জানা নেই। সবচেয়ে জুলুমের শিকার জামায়াতে ইসলামী।

আরো কষ্ট লাগে, এই বাজেট অধিবেশনেই আমাদেরকে এমনভাবে আক্রমণ করা হয়, মনে হয় আমরা এখনো আওয়ামী শাসনের মধ্যেই আছি। আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, এদেশে সবার। সবাই এদেশকে ভালবাসি। আমার বিশ্বাস, কোন দলই দেশের অকল্যাণ চায় না। জনগণের কল্যাণের জন্যই বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেই বাজেট জনগণের কল্যাণ করবে কি করবে না, তা এখনই বলা যাবে না। আমরা যতই সুন্দর কথা বলি না কেন, এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি উপকার পেলেই সুন্দর হবে।

এটিএম আজহার বলেন, বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবায়নই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আহরণে অনিশ্চয়তা, ঋণের অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং

উন্নয়ন ব্যয় সংকোচনের বাজেট বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলতে পারে।

তিনি বলেন, আমাদের কথায় সরকারি দল আপত্তি করলেও সরকার যদি এক বছর বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারে যে, এই বাজেট উচ্চাভিলাষী, ঋণ নির্ভর না এবং বাস্তবায়নযোগ্য তাহলে আমরা আপনাদের স্বাগত জানাবো।

তিনি বলেন, দেশে সুদ চলতে পারে না। এর বিকল্প হিসেবে সরকার ইসলামী বন্ডের মাধ্যমে জনগণের কাজ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারে। এটা ইতোমধ্যে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইসলামী বন্ড (সুকুক) চালু করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক বন্ড বিতরণ করা হয়েছে। দেশকে সুদমুক্ত করতে চাইলে এক-দুই বছরে পারবো না, তাহলে সুকুক চালু করতে পারলে ধীরে ধীরে সুদমুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।

এটিএম আজহার বলেন, জামায়াতে ইসলামী শুধু আওয়ামীলীগের দ্বারাই নির্যাতিত হয়নি। আমরা সংসদে বিরোধীদল হিসেবে শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করেছে, আমাদের সদস্যরা এমন কোন কথা বলেননি। বাজেটের দুর্বলতাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

তিনি বলেন, যত বড় বাজেটই হোক না কেন, তা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় সমস্যা দুর্নীতি। গত অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশিত ১৭ বছরে শ্বেতপত্রে দেখা গেছে-২৭ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। তাহলে বাংলাদেশ গরিব-এটা কীভাবে বলবো? নিশ্চয় বাংলাদেশ গরিব নয়। সমস্যা হলো-৫৪ বছরে সৎ নেতৃত্ব ও সততার সঙ্গে দেশ পরিচালিত না হওয়ায় সম্পদ লুটপাট হয়েছে, জনগণের কোন ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। দলের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।

তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা কিভাবে বিশ্বাস করি যে, আপনারা সেই পথে পা বাড়াবেন না? অতীতের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, পাঁচবার আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, সামনে যে চ্যাম্পিয়ন হবো না, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে? তাই কথা নয়, কাজের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত হয়ে বাজেটকে অক্ষরে অক্ষরে পালনের চেষ্টা করুন। ৩৪৮ জন এমপি যদি আমরা একযোগে দুর্নীতি না করার শপথ করলে দুর্নীতি বাংলাদেশ থেকে উৎখাত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

এটিএম আজহার বলেন, দুর্নীতি করে শিক্ষিত লোকেরাই। আমরা অনেক উন্নয়ন করেছি, কিন্তু চারিত্রিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় কোন আমুল পরিবর্তন করিনাই। শিক্ষামন্ত্রী অনেক ভালভাল কথা বলেছেন, কিন্তু ধর্মীয় ও দ্বীনি শিক্ষা ছাড়া কোন সৎ লোক তৈরি হয় না। আইন দিয়ে লোক সৎ করা যায় না।

তাই তিনি আগামী তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদেরকে অন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় জোর দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানান। তাহলে আধুনিক ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে সম্ভাবনাময় দেশকে দুনিয়ার মাঝে সুন্দর করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন, জুলাই যুদ্ধের মাধ্যমে নতুন করে দেশকে সাজানোর জন্য আমরা এই পর্যায়ে এসেছি। কিন্তু গত চারমাসের কর্মকাণ্ডে দেখলাম, আমরা বিরোধীদলীয় এমপিরা সবচেয়ে বৈষম্যের শিকার। ১:১০, ১:১৫ পর্যন্ত আমাদের বরাদ্দের মাঝে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সবার আগে বাংলাদেশ শ্লোগান দেয়া হলেও বাস্তবে সবার আগে বিএনপি, তার আগে বিএনপির এমপিরা।

যেকোনো বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। ১৭ ফেব্রুয়ারি এ সরকারের শপথের সময় তারা সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেন না। এতে ৭০ ভাগ জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা ও দাবি যদি পূরণ করতে না পারেন, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে না। আমরা দেশকে এগিয়ে নিতে চাই।

তিনি বলেন, যে বিষয় সংসদে ফয়সালা হওয়া উচিত, তা বাইরে নিয়ে যাবেন না। এটা কারো জন্য ভাল হবে না। বিপ্লবের ডাক দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৩৬ চেতনা বাস্তবায়ন ও ধারণ করলে জনগণই বিপ্লবের ডাক দেবে। যতই চেষ্টা করেন, জোর করে ক্ষমতায় থাকা যায় না। জনগণের পালস বুঝে, অবিলম্বে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন।

জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধ হলে এই শূন্যস্থান পূরণ করবে কে? আপনারা কি একদলীয় শাসন কায়েম করবেন নাকি আওয়ামীমীলীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন? আমরা মনে করছি চাচ্ছেন। কারণ চারমাসেও প্রেসিডেন্ট খুঁজে পেলেন না, ফ্যাসিস্ট প্রেসিডেন্টকে রাখার চেষ্টা করছেন। নিজেরা প্রেসিডেন্ট ঠিক করুন।

আমরা নাকি জান্নাতের টিকিট বিক্রি করি। আমার একটা লাগবে। কি রকম? কেন এ কথা বলেন? হ্যাঁ আমাদের টিকিট বিক্রি করি। সেটা হলো নামাজ পড়লে, রোজা রাখলে জান্নাতে যাবে। এটেই টিকিট, এটা আল্লাহই দিয়েছেন।

এ ধরণের অবান্তর কথা বলে বিভ্রান্ত করবেন না। ১৭ বছর অপপ্রচার করে ১৭ সিট থেকে ৬৮ সিট এসেছে।

তিনি এলাকার জন্য দাবি জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে তিস্তা ব্যারাজ করা হোক। কাস্তা রাস্তা পাকা করা হোক। মাদ্রাসা শিক্ষকদের দাবি বাস্তবায়ন করা হোক।

এস