মুসলিম মিরর তাকে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী মুসলিমের একজন হিসেবে ঘোষণা করেছে। তিনি নকশবন্দি তরিকার একজন পণ্ডিত এবং বিখ্যাত বুজুর্গ জুলফিকার আহমদ নকশবন্দির শিষ্য। সাজ্জাদ নোমানী নিজ শহরে দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা ও দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং কোরআন অধ্যয়নে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। তার বাবা মনজুর নোমানী ছিলেন একজন বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত, ধর্মতত্ত্ববিদ, সাংবাদিক, লেখক ও সমাজকর্মী। তার দাদা সুফি মুহাম্মদ হুসাইন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও জমিদার। সফরে আমার দেশকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী। গত সপ্তাহে রাজধানীর নিকুঞ্জের একটি রেস্ট হাউসে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন আলী হাসান তৈয়ব
প্রশ্ন : দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ সফরে এসেছেন, আপনাকে স্বাগতম। কেমন দেখেছেন বাংলাদেশকে?
সাজ্জাদ নোমানী : আপনাকেও মোবারকবাদ। প্রায় ৪০ বছর আগে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় বয়ান করার জন্য এসেছিলাম। দীর্ঘদিন পর আবার জীবনের পড়ন্তবেলায় আল্লাহ আপনাদের দেশে এনেছেন এজন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। বরাবরের মতোই এই দেশ ও দেশের মানুষকে ধর্মপ্রাণ, আন্তরিক, সহৃদয় ও ভালোবাসা পেয়েছি। অনেক বদলে গেছে দেশের পথঘাট। অনেক উন্নয়নও হয়েছে। তবে মানুষগুলো আগের মতোই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসাময় দেখছি।
প্রশ্ন : আপনি যেমনটি বললেন, এদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। মুসলিমরা এখানে সংখ্যাগুরু। তারপরও রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক নেতৃত্বে আলেমরা নেই! সেটি হলে এদেশ ইসলামের জন্য রোল মডেল হতে পারত। এ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সাজ্জাদ নোমানী : দুঃখজনক হলেও সত্য, এটি উলামায়ে কিরামেরই অসফলতা। এর কারণ, আলেম ও দাঈদের সাধারণ জনগণ, বিশেষত আধুনিক শিক্ষিত তরুণদের কাছে টানার ক্ষেত্রে সফল না হওয়া। এর দায়ভার উভয় পক্ষেরই। দেখুন, আমরা মাদরাসার যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছি, তারা (কলেজ-ভার্সিটির ছাত্ররা) যদি সেই পরিবেশে পড়াশোনা করত, তবে তারাও আমাদের মতোই হতো। আর আমরা যদি স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তবে আমরাও তাদের মতোই হতাম। তাদের দোষারোপ না করে আমরা তাদের সেই পরিবেশ তৈরির জন্য যথাযথ উদ্যোগ নিতে পারিনি। পরস্পর মতভেদ বাদ দিয়ে জাতির এই প্রয়োজনকে আমরা অগ্রাধিকার দিতে পারিনি।
তবে এখনও বসে থাকেলে হবে না। এখনই কাজ শুরু করতে হবে। শুরুতে তাদের অনভিপ্রেত কথা বা আচরণগুলো একটু সহ্য করুন। স্কুলে-স্কুলে প্রবন্ধ লেখা ও কুইজ প্রতিযোগিতা আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাদের ইসলামি বিষয়ের বইপত্র অধ্যয়ন করানো হোক। তাদের আপ্যায়ন ও ভালোবাসায় সিক্ত করা হোক, তাদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হোক, তাদের বুকে জড়িয়ে নেওয়া হোক। মসজিদে কোরআনের দরস বা পাঠচক্রে তাদের সম্মানের সঙ্গে ডাকা হোক। এমনকি তারা যদি হাফপ্যান্ট পরেও মসজিদে আসে, তবু কেউ যেন তাদের বাধা না দেয় বা তিরস্কার না করে।
মোদ্দাকথা, তরুণরা ভালোবাসার যোগ্য। তাদের বুকে টেনে নিন, কাছে টানুন। আজ তাদের মধ্যে যে ঘাটতি বা ত্রুটি আছে, তা ইনশাআল্লাহ চিরকাল থাকবে না। মহব্বত দিয়ে বিশ্ব জয় করা যায়, তাই ভালোবাসার মাধ্যমে কাজ নিন। ইনশাআল্লাহ, তারা সবাই দ্বীনের কাছাকাছি আসবে।
প্রশ্ন : কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলোতে ‘ফিকরি ইরতিদাদ’ বা নাস্তিক্যবাদ মোকাবিলায় আলেম সমাজ এবং দাওয়াতি সংগঠনগুলোর কী কর্মপন্থা অবলম্বন করা উচিত?
সাজ্জাদ নোমানী : দেখুন, প্রথমেই আমাদের অনুসন্ধান করা উচিত যে, এই ফিকরি ইরতিদাদ কেন সৃষ্টি হলো? তাদের মনে কী কী সংশয় আছে? তাদের আপত্তি বা দ্বিধা কোথায়? কারো হয়তো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক বিয়ে নিয়ে আপত্তি আছে, কারো হয়তো জিহাদ নিয়ে সংশয় আছে, কারো বা পর্দা নিয়ে আপত্তি আছে।
তো এই সবগুলো বিষয়ের পেছনে যে যৌক্তিক ব্যাখ্যা বা প্রজ্ঞার দিক রয়েছে, তা যদি তাদের বোঝানো যায়, তবে তাদের অন্তর প্রশান্ত হবে এবং ইনশাআল্লাহ তারা এই চিন্তাগত বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসবে। আমি তো বলি— আজকের যুগে যে তরুণ চিন্তাগত বিভ্রান্তি বা নাস্তিকতার শিকার না হয়, সেটাই বরং আশ্চর্যের বিষয়! যে শিকার হয়, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ, তাদের এডুকেশনাল সিস্টেমই এমনভাবে সাজানো, যা মানুষের মনে সংশয় তৈরি করে।
প্রশ্ন : আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে দ্বীনের দাওয়াত এবং সমাজ সংস্কারের জন্য কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?
সাজ্জাদ নোমানী : উলামা-আওয়াম উভয় শ্রেণির বন্ধন মজবুত হওয়া উচিত। একে অন্যের কাছাকাছি আসা উচিত। মাদরাসার শ্রেণি এবং কলেজ-ভার্সিটির শ্রেণি—এই দুইয়ের কাছাকাছি আসাটা অত্যন্ত জরুরি। ইনশাআল্লাহ এতে দেশ শক্তিশালী হবে, পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ দূর হবে, দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে। আলেমদের যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন হবে এবং তরুণদের যোগ্যতারও সর্বোত্তম ব্যবহার হবে। উভয় শ্রেণির জানাশোনা ও সমন্বয় অপরিহার্য।
প্রশ্ন : নবীজি (সা.) তো নবী হওয়ার আগে থেকেই মানবসেবার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করেছেন। তাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তো জনগণের মনে জায়গা করে নিতে নবীর ওয়ারিশ এদেশের আলেম সমাজের কী কর্মপন্থা অবলম্বন করা উচিত?
সাজ্জাদ নোমানী : সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে ‘খেদমতে খালক’ বা মানবসেবায়। আমাদের উচিত নিজেদের সামর্থ্য ও সম্পদগুলো একত্র করে সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা মানবসেবায় কাজে লাগানো। গরিব শিশুদের পড়াশোনায় খরচ করা, রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় করা, বিধবা বোন ও মেয়েদের সাহায্যে ব্যয় করা, এতিম শিশুদের দায়িত্ব নেওয়া এবং এ ধরনের আরো যত প্রয়োজন আছে, সেগুলোতে খরচ করা। আর যেসব এলাকা বেশি দারিদ্র্যের শিকার, সেখানে আমাদের মেহনত বেশি হওয়া উচিত। এমনকি যদি কোনো অমুসলিমও গরিব হয়, তবে আমরা তাকেও সাহায্য করব। তবেই তো সেটি সত্যিকারের খেদমতে খালক হবে!
প্রশ্ন : কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে চিন্তাগত পরিপক্বতা, ইসলামি স্বকীয়তা এবং দাওয়াতি চেতনা তৈরির জন্য আপনি কী দিকনির্দেশনা দেবেন?
সাজ্জাদ নোমানী : আমি তো আগেই বললাম, মসজিদগুলোয় তাফসির ও হাদিসের হালাক্বা কায়েম করা হোক, নানা ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করা হোক। তাদের মধ্যে ইসলামি সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া হোক। এসবের মধ্য দিয়ে তারা ইসলামের সৌন্দর্য অবলোকন করে অনেকেই দ্বীনের কাছাকাছি চলে আসবে।
প্রশ্ন : দেশের শাসক, রাজনৈতিক নেতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে দ্বীনের দাওয়াতের কাজটি কোন প্রক্রিয়ায় আঞ্জাম দেওয়া উচিত?
সাজ্জাদ নোমানী : এ ক্ষেত্রে ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি এবং হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত। তাদের হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া উচিত, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিরোধী হওয়া উচিত নয়। বরং তাদের এই বিশ্বাস দেওয়া উচিত যে, আমরা চাই আপনাদের সরকার সফল হোক, আপনারা আরো বেশি জনপ্রিয় হোন। আমরা আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী, আমরা আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বী, শত্রু, বিরোধী বা অপজিশন নই। আমরা যদি বিরোধী বা সাংঘর্ষিক অবস্থান নিই, তবে তারাও আমাদের বিরোধী হয়ে যাবে; আর তাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা আছে। ফলে তখন এই শক্তি দাওয়াহর বিপরীতে ব্যবহার হবে। যা আখেরে দ্বীন ও দশের ক্ষতি বয়ে আনবে।
প্রশ্ন : বর্তমান যুগে ইসলামপ্রচারে কোন বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত এবং দাঈদের কোন কোন বিষয়ে বেশি মনোযোগ নিবদ্ধ করা উচিত?
সাজ্জাদ নোমানী : নিজের ‘মাসলাক’ বা মতাদর্শের দাওয়াত দেওয়ার বদলে খাঁটি ইসলামের দাওয়াত দেওয়া উচিত। মাসলাকের ওপর উম্মত কখনো ঐক্যবদ্ধ হবে না, কিন্তু ইসলামের ওপর তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে। ব্যাস, এটিই যথেষ্ট। আমরা যদি মৌলিক ইসলামের ওপর জোর দিই, তবে ইসলাম নিয়ে কারো কোনো মতবিরোধ নেই। আমরা তো দেখি, অনেকেই নিজ দলের দিকে ডাকেন, নিজ সংগঠনের দিকে ডাকেন, অথচ ডাকা উচিত একমাত্র ইসলামের দিকে।
প্রশ্ন : আধুনিক যুগে ইসলামি রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য কী হওয়া উচিত? আপনার দৃষ্টিতে ইসলামি রাজনীতির সঠিক মানহাজ, অগ্রাধিকার এবং রূপরেখা কী হওয়া উচিত? বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো একটি দেশের প্রেক্ষাপটে?
সাজ্জাদ নোমানী : সবার সঙ্গে ন্যায়বিচার এবং সবার উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা চালানো। সবার! সে দক্ষিণবঙ্গের হোক বা উত্তরবঙ্গের, মুসলিম হোক বা অমুসলিম—সবার উন্নতি ও সবার সঙ্গে ন্যায়বিচার! ইসলামি রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি এমনটাই হওয়া উচিত। তবেই ইনশাআল্লাহ জনগণ ইসলামি জীবনব্যবস্থার সৌন্দর্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবে।
প্রশ্ন : একজন সফল দাঈর মধ্যে কোন কোন জ্ঞানগত, চিন্তাগত, চরিত্রগত এবং আমলগত গুণাবলি থাকা আবশ্যক?
সাজ্জাদ নোমানী : খাঁটি ঈমানের সঙ্গে ‘আমালে সালেহ’ (ভালো কাজ) থাকা আবশ্যক। আর দাঈকে অহংকার থেকে খুব শক্তভাবে বেঁচে থাকতে হবে। একজন সাধারণ মুসলমানের মতোই তার আচরণ হওয়া উচিত। আল্লাহ যেমনটি কোরআনে বলেছেন, ‘তার কথার চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকে, নেক আমল করে এবং বলে যে আমি মুসলমানদেরই একজন?’
প্রশ্ন : মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, দ্বীনের তাজদিদ (সংস্কার) এবং চিন্তাগত জাগরণের বিষয়ে আপনার কর্মপন্থা ও বার্তা কী?
সাজ্জাদ নোমানী : আল্লাহর শোকর যে, আমরা নিজেদের দেশে অনেক দ্বীনি মেহনত করতে পারছি...। আমাদের মেহনতের একটি বড় ময়দান হলো সাধারণ মুসলমান। আম মুসলমানদের মধ্যে ইসলামি চেতনা এবং ইসলামি সভ্যতা ও শিষ্টাচার জাগিয়ে তোলার জন্য দেশজুড়ে আমার সফর হয়। বিভিন্ন জায়গায় কোরআনের দরসের হালাক্বা হয়, ইসলাহি মজলিস হয়।
আর আলহামদুলিল্লাহ, এখন অবস্থা এমন হয়েছে—আল্লাহর শোকর—মানুষের এত বেশি রুজু (আকর্ষণ ও ঝোঁক) তৈরি হয়েছে যে, আমি যে এলাকাতেই যাই, সেখানকার আয়োজকদের হাত-পা ফুলে যায় (বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে)! সব ব্যবস্থাপনা ফেইল করে যায়। কারণ, তারা হয়তো আশা করে ১০ হাজার মানুষ আসবে, আর সেখানে চলে আসে ৫০ হাজার মানুষ! তারা ভাবে ৫০ হাজার আসবে, কিন্তু চলে আসে দেড় লাখ! এত বিপুল মানুষের সমাগম হয়—পুরুষদেরও, নারীদেরও এবং তরুণ ছাত্রছাত্রীদেরও। তারা সব ব্যবস্থা করতে হিমশিম খায়।
তো তাদের মধ্যে দ্বীনের প্রতি একটি প্রবল আকর্ষণের অবস্থা তৈরি হয়ে গেছে। আর (ভারতে) যত বেশি জুলুম-নির্যাতন হচ্ছে, উম্মত তত বেশি আবার ইসলামের দিকে ফিরে আসছে। এটিও আল্লাহর এক অদ্ভুত হিকমত! কোরআনের ভাষায়—‘হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ তার মধ্যেই তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে।’ আলহামদুলিল্লাহ!
প্রশ্ন : নারী অঙ্গনে ইসলাম প্রচারে আলেম ও দাঈদের কী কী করা উচিত?
সাজ্জাদ নোমানী : এই সফরে আমার সবচেয়ে বড় অভিযোগই এটা নিয়ে। এটা খুবই আফসোসের বিষয়। এখানে আমার জন্য নারীদের কোনো প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়নি। আমি নিজ দেশের যেখানেই যাই, আগেই শর্ত জুড়ে দিই যে—পুরুষদের প্রোগ্রাম হোক বা না হোক, কিন্তু নারীদের জন্য বিশেষ করে তরুণীদের জন্য প্রোগ্রামের আয়োজন করতে হবে। আমি এই শর্ত দিই। আর আপনারা অবাক হবেন যে, আমি অনেক সময় পর্দার আড়ালেও বসি না, বরং সুন্দর পর্দার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাদের সামনে বসিয়ে বয়ান করি। আপনারা এখনও কল্পনা করতে পারছেন না, পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নারীদের ভূমিকা কত বড়। নারীরা এই সমাজের অর্ধেক বা তার চেয়েও বেশি। তাদের ইসলাম থেকে দূরে রেখে কীভাবে মুসলিম উম্মাহ বা দেশ গড়বেন?
প্রশ্ন : এই সফরে বাংলাদেশের সর্বসাধারণের প্রতি আপনার বিশেষ বার্তা কী?
সাজ্জাদ নোমানী : আপনারা দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাধনার পর একটি সুন্দর স্বাধীন দেশ পেয়েছেন। ২৪-এর জুলাই আন্দোলনে আপনাদের তরুণ-তরুণীরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে একটি মুক্ত বৈষম্যহীন দেশের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। সেই উত্তাল দিনগুলো আমি ভারতে থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। কলিজার টুকরা সন্তানদের জন্য দিল খুলে দোয়া করেছি। তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে ওদের জন্য কেঁদেছি। আমাদের দেশেও জেন-জি প্রজন্ম আন্দোলন করছে। আপনাদের দেখে নেপালেও সফল আন্দোলন হয়েছে। আপনারা সফল সংগ্রামের জন্য বিশ্বের সামনে মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
এখন আপনাদের উদ্দেশে আমার উদাত্ত আহ্বান হলো, প্রিয় মাতৃভূমিকে একটি ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার যে সুযোগ আপনারা পেয়েছেন, একে প্রকৃত অর্থেই একটি কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলুন। প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন উন্নয়ন হয়। ইসলাম কী? আমি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করি, তা হলো—
‘A divine program revealed by Almighty God to ensure all-round development of the entire mankind.’ (মানবজাতির সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বশক্তিমান আল্লাহ কর্তৃক নাজিল করা একটি ঐশী কর্মসূচি)। মানবতার সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য, মানবতার পরম স্নেহশীল প্রতিপালক যে কর্মসূচি বা প্রোগ্রাম পাঠিয়েছেন, তাকেই ইসলাম বলে।
আমরা যদি ইসলামকে এভাবে উপস্থাপন করি, তবে কে তা অপছন্দ করবে? কিন্তু আমরা তো ইসলামকে এভাবে উপস্থাপন করি যে—‘ক্ষুধার্ত থাকো, পেটে পাথর বাঁধো, অনাহারে থাকো, শুধু মুজাহাদা করো আর কোরবানি দাও! আল্লাহর রাসুলের পেটে তো দুটি পাথর বাঁধা ছিল! তখন সাধারণ মানুষ ওই বয়ানকারী মাওলানার পেটের দিকে তাকিয়ে দেখে যে তার পেটে কয়টি পাথর বাঁধা আছে!
আমাদের অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি (Priority) ভুল। ভাই, আমরা যেসব বিষয়কে হাইলাইট করছি, সেগুলো আজকের দুনিয়ায় ওই অর্থে প্রয়োগযোগ্য নয়। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ এখন রিজিকের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, সেই অভাবের পরিস্থিতি এখন আর নেই। তাই এই যুগে বলা উচিত—‘হালালভাবে প্রচুর উপার্জন করো, বিত্তবান হও। তুমি ধনী হও এবং ১০০ এতিম শিশুর দায়িত্ব নাও, ৫০ জন গরিব মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করো। এতিমখানা বানাও, প্রচুর দান-সদকা করো। অন্যের ওপর জুলুম না করে প্রচুর কামাই করো।’
আপনারা যদি বয়ানে ভিন্ন আঙ্গিকে ইসলামকে তুলে ধরেন, তবে মানুষ তা সহজে নিতে পারবে। এ জন্য বর্তমানে সাধারণ মানুষের সামনে কী বলতে হবে, সেটাও আমাদের নিজেদের বড়দের কাছ থেকে শিখতে হবে। নইলে তো মানুষ ঘাবড়ে যাবে!
এমএম