পর্দা সম্পর্কে শুধু আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেননি; রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত বিভিন্ন হাদিস এবং বিখ্যাত সাহাবিদের উক্তিও কথিত রয়েছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছেÑ‘আল্লাহ নারীদের চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তাদের চেনা না যায়।’ এছাড়া আলী (রা.)-এর বর্ণিত বিখ্যাত উক্তি কথিত রয়েছে, ‘নারীরা যদি জানত যে পুরুষরা তাদের আড্ডায় তাদের নিয়ে কী কী আলোচনা করে বা তাদের প্রতি কেমন দৃষ্টি রাখে, তাহলে তারা নিজেদের লোহা দিয়ে ঢেকে রাখত।’ অর্থাৎ, শুধু কোরআনেই নয়, হাদিস এবং সেই সময়কার বিখ্যাত সাহাবিদের উক্তিতেও পর্দার গুরুত্বের দিকটি সুচারুরূপে ফুটে উঠেছে।

তবে বর্তমান পশ্চিমা কুসংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত সমাজ এ ফরজ বিধানটি মানতে যেন নারাজ। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, পুরো জেনারেশন আজ শরীর প্রদর্শনের এক কুৎসিত খেলায় মেতেছে। এসব আধুনিক সংস্কৃতিমনা নারী পর্দানশিন নারীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। শরীর প্রদর্শনকারী নারীদের বিপরীতে রয়েছে পর্দানশিন নারী সমাজ, যারা নিজেদের শরীর আবৃত রাখতেই সদা নিয়োজিত। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ নয়; বরং একই মুদ্রার একই পিঠ হয়েও তারা আজ বিচ্ছিন্ন, ভিন্ন মতাদর্শে লালায়িত।

ইসলামের আদর্শে উজ্জীবিত নারীরা যখন মার্জিত পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করছে, তখন তা উচ্চ ডিগ্রিধারী কিংবা অক্ষরজ্ঞানহীন তথাকথিত সমাজ বা সম্প্রদায়ের কাছে দৃষ্টিনন্দন লাগে না। হেদায়েতপ্রাপ্ত ইসলামের আদর্শে নিবেদিতপ্রাণ মুসলিমদের আকাশ কখনোই মেঘমুক্ত ছিল না। আকাশে কালো মেঘের আনাগেনা সবসময় প্রতীয়মান। সেই সুবাদে পর্দানশিনদের আকাশ মেঘমুক্ত থাকার কথা নয়। যখন তারা নিজেদের ধর্মের ফরজ বিধান পালনে একনিষ্ঠ, তখনই কালো মেঘ নামক তথাকথিত সমাজ দাঁড়ায় প্রতিরোধক হিসেবে। মার্জিত পোশাক পরিধানে তাকে হতে হয় বন্ধুমহল, আত্মীয়স্বজন, এমনকি শ্রেণিকক্ষে স্যারদের মাধ্যমেও অপদস্ত; হতে হয় হাসির পাত্র। বাংলাদেশে এমন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকমণ্ডলী রয়েছে, যেখানে মেয়েরা উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে কিংবা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আরোপিত নিয়ম মেনে নিতে গিয়ে পর্দা করতে অক্ষম হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এর প্রভাব আরো ব্যাপক ও ভয়াবহ। ভাইভা, প্রেজেন্টেশনের মতো কার্যাবলিতে শাড়ির কদর অনেক বেশি। তাই বোরকা পরা মেয়েটাও ভালো নম্বরের আশায় বোরকা ছেড়ে শাড়ি পরিধান করছে। সেখানে মুখ ঢাকা নারী শিক্ষার্থীকে অনেক সময় স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা হয় না।

গ্রামাঞ্চলে পর্দার বিধান মানা ধর্মপ্রাণ মা-বোনদের পক্ষে আরো দুরূহ হয়ে ওঠে। সমাজের লোকের কটূক্তি বাবা-মায়ের অজ্ঞতা কিংবা অসহযোগিতার মনোভাবের ফলেই তাদের এই বিধান মানা অসম্ভবপ্রায় হয়ে ওঠে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা-মা বিশেষ শিক্ষিত বা জ্ঞানসম্পন্ন না হ‌ওয়ায় সচেতনতার অভাবে নিজেরাই নিজেদের মেয়েকে মাঠে বের করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। দ্বীনের জ্ঞানহীন অভিভাবকরা পর্দা পালনের মতো পরিবেশ তৈরি করতে সম্মত না, ফলে মেয়েরা চাইলেও তাদের পর্দার বিধান পালন করতে পারে না উন্মুক্ত পরিবেশে। একইভাবে একটি মেয়ে যখন শ্বশুরবাড়িতে যায়, সেখানে উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে পর্দা পালন করতে অক্ষম হয়।

তাই ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুফু মেনে বিয়ের কথা বলা হয়েছে। কুফু শব্দের অর্থ হলো সমতা, সমতুল্য বা সমকক্ষ। বৈবাহিক ক্ষেত্রে বর-কনের দ্বীনদারিতা, বংশ, সম্পদ, সামাজিক অবস্থান, পেশাগত দিক থেকে সম্মান বা কাছাকাছি পর্যায়ের হওয়াকে কুফু বলে। এটি মূলত দাম্পত্য জীবনের বোঝাপড়াবিষয়ক একটি ইসলামিক ধারণা। কুফু মেনে বিয়ে না করলে একটি মেয়ে তার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে উপযুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতির অভাবে পর্দা পালন করতে ব্যর্থ হয়। তাই পর্দা পালনে আগ্রহী বোনদের কুফু মেনে বিয়ে করা উত্তম। এতে পর্দার বিধান পালনের পথ অনেকটাই সুগম হয়।

বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ায় নির্মিত সমাজে দুঃখজনকভাবে পর্দার অবনতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। যদিও দেশে ইসলামিক আলোচনা হয়ে থাকে, তবে তার সংখ্যা অপ্রতুল। বেশি বেশি ইসলামিক আলোচনা সভার আয়োজন করতে হবে। আলোচনা সভার আয়োজন উদ্দেশ্যহীনভাবে, কিংবা মসজিদের আর্থিক উন্নয়নকে উদ্দেশ্য করে নয়; বরং তা হতে হবে জ্ঞানদানের উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বর্তমানে এর মূল উদ্দেশ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে সভার আয়োজন করা হয়ে থাকে; যা জ্ঞানবিবর্জিত মানুষগুলোর কোনো উপকারে আসে না। ইসলামি জলসাগুলোয় নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে রেখে আলোচনা করা হলে ইসলামিক জ্ঞানবিবর্জিত এই লোকগুলো ইসলামের দিকে ধাবিত হতে সক্ষম হবে। জলসাগুলোর মূল লক্ষ্য হতে হবে এমনÑযে মা-বোন তাদের শরীর প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সেসব মা-বোনদের টনক নাড়ানো এবং এক‌ই সঙ্গে সেসব পুরুষ, যারা পর্দাকে কটাক্ষ দৃষ্টিতে দেখে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। উভয়ের সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। এছাড়া সব মা বোনকে নিজ নিজ স্থান থেকে সচেতন হতে হবে পর্দার ফরজ বিধানটি পালনে। তবেই দেশ ও রাষ্ট্রের অশ্লীলতা দূর হবে। দেশ হয়ে উঠবে শ্লীল, সুশৃঙ্খল ও মার্জিত।

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এমএম