ইমেইলের প্রেরক জানত, আউয়ার ‘ভাস্তামো’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাইকোথেরাপি নিচ্ছিলেন। দাবি করা হয়, ভাস্তামোর রোগী ডাটাবেস হ্যাক করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০০ ইউরো (প্রায় ১৭৫ পাউন্ড) বিটকয়েনে পরিশোধ না করলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা বেড়ে ৫০০ ইউরো হবে। টাকা না দিলে প্রকাশ করা হবে তার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর এবং থেরাপি সেশনের বিস্তারিত নোট সবকিছু।
২০২০ সালের অক্টোবরে এমন ভয়ংকর ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন ভাস্তামোর ৩৩ হাজার রোগী। আত্মহত্যার চেষ্টা, পরকীয়া, শিশু যৌন নির্যাতনের মতো গভীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেরাপিস্টদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া মানুষগুলো এক মুহূর্তে হয়ে ওঠেন জিম্মি।
৫৬ লাখ জনসংখ্যার ফিনল্যান্ডে প্রায় সবাই কোনও না কোনোভাবে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কাউকে চিনতেন। এটি পরিণত হয় দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিন জরুরি বৈঠক ডাকেন। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
রোগীদের কাছে ইমেইল পাঠানোর আগেই হ্যাকার ভাস্তামোর পুরো ডাটাবেস ডার্ক ওয়েবে প্রকাশ করে দেয়। অজানা সংখ্যক মানুষ সেগুলো পড়েছে বা ডাউনলোড করেছে। সেই নোটগুলো আজও ছড়িয়ে আছে।
আউয়ার তার থেরাপিস্টকে এমন কথা বলেছিলেন, যা পরিবারকেও জানাননি— বিঞ্জ ড্রিংকিং, অনেক বড় বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে গোপন সম্পর্ক। সবকিছু ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তার জীবন ভেঙে পড়েছিল। তবু এই ঘটনা তাকে ধ্বংস না করে বরং নিজের ভেতরের শক্তি আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।
২০১৫ সালে প্রথম থেরাপি শুরু করেন আউয়ার। থেরাপিস্টের ওপর তার পূর্ণ আস্থা ছিল। কিন্তু কীভাবে তার কথোপকথন নোট করা হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি জানতেন না। হ্যাকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি ডার্ক ওয়েবে নোটগুলো খুঁজতে বাধ্য হন। নিজের নোট না পেলেও দেখেন, অন্যদের যন্ত্রণাকে নিয়ে হাসাহাসি চলছে— এমনকি ১০ বছর বয়সী শিশুর থেরাপি নোট নিয়েও।
সব রোগীর নোট প্রকাশ পাওয়ার পর আউয়ারের মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। বাসা থেকে বের হতে, গণপরিবহনে উঠতে বা পোস্টম্যানের দরজা খুলতেও ভয় পেতেন তিনি।
দীর্ঘ দুই বছরের তদন্তের পর ২০২২ সালের অক্টোবরে ফিনিশ পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে পরিচিত সাইবার অপরাধী জুলিয়াস কিভিমাকিকে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্রান্সে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি ফিনল্যান্ডে ফেরত যান। মামলার বাদী ছিলেন ২১ হাজারের বেশি সাবেক রোগী। এতো মানুষের জায়গা না হওয়ায় সিনেমা হলসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রায়াল দেখার ব্যবস্থা করা হয়।
রায়ে কিভিমাকিকে ছয় বছর সাত মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও তিনি দায় অস্বীকার করে চলেছেন। আউয়ার বলেন, “এই শাস্তি সব কিছুর ক্ষতিপূরণ নয়, তবে আদালত আমাদের কষ্টকে স্বীকৃতি দিয়েছে।”
হ্যাকের পর আউয়ার নিজের থেরাপি নোটের হার্ড কপি সংগ্রহ করেন। সেখানে লেখা ছিল—তিনি রাগী, আবেগপ্রবণ, তিক্ত; তার বর্ণনা এলোমেলো; বয়সজনিত দুর্বলতা রয়েছে। এসব পড়ে তিনি ভেঙে পড়েন।
ডাটা লিকের পাঁচ বছর পরও ভুক্তভোগীরা নিরাপদ নন। ডার্ক ওয়েবে এমন সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হয়েছে, যেখানে নাম লিখলেই নোট খুঁজে পাওয়া যায়। এই ঘটনায় থেরাপির ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে গেছে। আইনজীবীদের ভাষ্য, নোট চুরির খবর জানার পর অন্তত দুজন আত্মহত্যা করেছেন।
শেষ পর্যন্ত ভয়কে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেন আউয়ার। সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে প্রকাশ করেন, পরিবারকে সব জানান। সবার সমর্থন পান। নিজের গল্পের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে লেখেন একটি বই—‘এভরিওয়ান গেটস টু নো’ (সবাই জানতে পারে)।
আজ তিনি মেনে নিয়েছেন— তার গোপন কথা হয়তো চিরকালই অনলাইনে থাকবে। নিজের মানসিক শান্তির জন্য আউয়ার বলেন, ‘এ নিয়ে না ভাবাই সবচেয়ে ভালো।’
সূত্র: বিবিসি
এমএম