মীর্জা মসিউজ্জামান : বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লির টানাপড়েন সংস্কৃতির মধ্যেই, ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন পেশাদার রাজনীতিবিদ ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী। ফরেন সার্ভিসের দীর্ঘদিনের চেনা বৃত্ত ভেঙে একজন হেভিওয়েট বিজেপি নেতাকে ঢাকায় পাঠানোকে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট’ হিসেবেই দেখছে কূটনৈতিক মহল।

তবে, বাংলাদেশে পা রেখেই দীনেশ ত্রিবেদীর ‘দুই দেশের শক্তি ও গণতন্ত্র এক করার’ বার্তা এবং ‘১৪০ কোটির সঙ্গে ২০ কোটি যোগ করে ১৬০ কোটির মহাশক্তি’ গড়ার তথ্য ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নতুন সমীকরণ ও ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এই বার্তাটি কি কেবলই দ্বিপাক্ষিক মৈত্রীর ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক ভাষা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে দিল্লির কোনো গভীর রাজনৈতিক এজেন্ডা নাকি মেরূকরণের ভিন্ন বার্তা? দেশের শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের গভীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঢাকার কূটনৈতিক টেবিল এখন আর কেবল মুখের কথায় বা আবেগি আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে রাজি নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং এ দেশের নাগরিকদের অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রধান শর্ত হতে হবে।

'১৬০ কোটির সমীকরণ' হিন্দু-মুসলিম বিচ্ছেদের বার্তা, নাকি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল?

নতুন হাইকমিশনারের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রথম এবং সবচেয়ে বড়ো যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, এই বক্তব্য কী প্রকারান্তরে দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক ‘হিন্দু-মুসলিম বিচ্ছেদের’ ক্ষতকে উসকে দেওয়ার কোনো প্রচ্ছন্ন বার্তা, নাকি তা আড়াল করার কৌশল?

দীনেশ ত্রিবেদী স্পষ্ট বলেছেন, তিনি শুধু ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের কথা বলছেন না, এর সাথে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষকেও যোগ করছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে 'একই আকাশ, একই বাতাস' এবং 'অভিন্ন স্বপ্নের' ফ্রেমে বেঁধে তিনি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যখন প্রায়শই ধর্মীয় মেরূকরণ বা অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে পুশইনের মতো ঘটনা ঘটে, তখন একজন বিজেপি ঘরানার রাজনীতিবিদের মুখে এই ‘১৬০ কোটির সমীকরণ’ মূলত একটি কৌশলগত ড্যামেজ কন্ট্রোল।

ভারতের ১৪০ কোটি (প্রধানত সনাতন ধর্মাবলম্বী) এবং বাংলাদেশের ২০ কোটি (প্রধানত মুসলিম) মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ‘ভাই-বোন ও মা’ সম্বোধন করার মাধ্যমে তিনি হয়ত এটি বোঝাতে চেয়েছেন যে, দিল্লি এই অঞ্চলকে ধর্মীয় বিভাজনের চোখে দেখছে না। তবে স্বাধীন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই ভাবছেন, দুই দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সময়ে এই ‘এক করে ফেলার বার্তাটি কি কোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপ?

ভারতের উগ্র-ডানপন্থি রাজনীতির সমীকরণ মাথায় রাখলে, এই বক্তব্যকে অনেকে ‘অখণ্ড’ বা ‘আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের’ অলিখিত রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবেও ব্যাখ্যা করতে পারেন, যা দুই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাকে স্পর্শ করে?

দীনেশ ত্রিবেদীর এই 'দুই শক্তি এক করার' বার্তাকে ঢাকার সাবেক কূটনীতিকরা বেশ সতর্কতার সাথে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তাদের মতে, শুভেচ্ছা বার্তার আড়ালে ভারতের এই নতুন কৌশলকে সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।

ঢাকার একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, "দুই দেশ এক করে ফেলার এখানে সুযোগ নেই, কারণ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার বার্তা স্পষ্ট যে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, তবে নিজস্ব অস্তিত্ব বজায় রেখে।"

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ এই বার্তাটির মূল সুর ধরে বলেন, বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এই স্বাধীনতা ভারতের সাথে একত্রিত হয়ে বা কোনো ব্লকের অংশ হয়ে মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য নয়। বাংলাদেশ নিজের শক্তিতে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়। একক কোনো দেশের আধিপত্য নয়, বরং 'পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং আত্মমর্যাদা' বজায় রেখেই প্রকৃত আঞ্চলিক শক্তি হওয়া সম্ভব।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহর পর্যবেক্ষণ : আমরা চাই দুই দেশ নিজ জায়গায় শক্তিশালী হবে, অন্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো রেখেই সার্কের অঞ্চলগুলো যদি একটা শক্তিশালী অঞ্চল হিসেবে পরিণত হয় বিশ্বের দরবারে, তাহলে তারা একটা স্থান দখল করে নেবে এবং সামষ্টিক সম্পর্কে একটা কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করতে পারবে।"

কূটনৈতিক মহল মনে করে, মিষ্টি কথায় বা 'একই আকাশ-একই বাতাস'-এর আবেগে ঢাকা-দিল্লির বর্তমান শীতল সম্পর্কের বরফ গলবে না। নতুন হাইকমিশনারের ‘মিশন’ কতটা সফল, তা মূল্যায়িত হবে তিনটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমসাময়িক সংকটের বাস্তব সমাধানের ওপর : পুশইন (Push-in) সংকট : ৫ আগস্টের পর সীমান্তে পুশইনের মতো ঘটনা চলমান, যা সম্পর্ককে তিক্ত করছে। বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক থেকেও এর সুরাহা হয়নি। এটি অবিলম্বে বন্ধ করা নতুন হাইকমিশনারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

গঙ্গার পানি চুক্তি : ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ নবায়ন এবং এর সুষম, লাভজনক বণ্টন নিশ্চিত করা। তিস্তা চুক্তি : দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির একটি যৌক্তিক ও চূড়ান্ত পরিণতি দেওয়া।

দীনেশ ত্রিবেদী একজন ঝানু রাজনীতিবিদ বলেই প্রথাগত কূটনীতিকদের চেয়ে অনেক বেশি আবেগি, রাজনৈতিক এবং সরাসরি বার্তা দিতে পেরেছেন। তার "দুই ডেমোক্রেসি মিলে ওয়ার্ল্ড পাওয়ার" হওয়ার বার্তাটি শুনতে আকর্ষণীয় হলেও, বাংলাদেশের কাছে এই মুহূর্তে ‘মহাশক্তি’ হওয়ার কাল্পনিক স্বপ্নের চেয়ে নিজের ‘সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা এবং ন্যায্য পাওনা’ (পানি ও সীমান্ত নিরাপত্তা) নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ কোনো ফাঁকা বুলি বা মুখের কথার রসায়নে বিশ্বাস করবে না। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকারগুলোর নিরাপত্তা, সীমান্তে বাংলাদেশিদের জীবনের নিরাপত্তা, পুশইন চিরতরে বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে যদি প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে শতভাগ বাস্তব ও আইনি নিশ্চয়তার অঙ্গীকার পাওয়া যায়, কেবল তবেই দীনেশ ত্রিবেদীর ‘১৬০ কোটির মহাশক্তি’ কিংবা ‘দুই শক্তি এক করার’ তথ্য নিয়ে বাংলাদেশ গভীরভাবে চিন্তা করতে পারবে।

অন্যথায়, এই বার্তাটি দিল্লির আরেকটি চাতুর্যপূর্ণ কূটনৈতিক প্রলেপ এবং হিন্দু-মুসলিম বিচ্ছেদের ক্ষতকে সাময়িকভাবে আড়াল করার কৌশল হিসেবেই গণ্য হবে। ত্রিবেদীর আগামী দিনের কার্যকলাপ, বিশেষ করে পুশইন বন্ধ, সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামানো ও তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের সাফল্যের ওপরই নির্ভর করছে এই কূটনৈতিক মিশনের প্রকৃত মূল্যায়ন।

এমএম