২০০৬ সালের এই দিনে রাজধানীতে মানবতাবিরোধী নির্মমতা প্রদর্শন করে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা নিয়ে ভয়াবহ তাণ্ডব চালায়। সেদিন ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে সাপ মারার মতো পিটিয়ে জামায়াত-শিবিরের ছয়জন নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের লাশের ওপর নৃত্য করে উল্লাস প্রকাশ করা হয়—যা সভ্য দুনিয়ায় অকল্পনীয়। শুধু পল্টন নয়, ওই তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে; ঢাকার বাইরে আরও নয়জন প্রাণ হারান।
ঘটনার পর দেশে-বিদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। কিন্তু ১৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পৈশাচিক ঘটনার বিচার হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। মামলা হলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে তা প্রত্যাহার করে নেয়। শহীদ পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। একদিন না একদিন এর বিচার হবেই, মানুষকে যেন আর কখনো এভাবে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করা না হয়।
তারা আরও বলেন, দ্বীন কায়েমের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গঠনে সাহসী মায়ের প্রয়োজন। আমরা আমাদের সন্তানদের আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেছি ইসলামের ও দেশের জন্য। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ পরিচালিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানান।
নতুন করে মামলার উদ্যোগ
এই ঘটনায় নতুন করে মামলা নেওয়া হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে মামলা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সব মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। এখন আমরা সেই মামলাগুলো পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছি।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পুনরাবৃত্তি
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরও স্বৈরাচার সরকার পতনের একদফা দাবিতে নয়াপল্টনে বিএনপি ও মতিঝিলে জামায়াতে ইসলামী মহাসমাবেশ করে। কিন্তু ২০০৬ সালের মতোই আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশের যৌথ সশস্ত্র হামলায় সে সমাবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই হামলায় যুবদলের এক নেতা নিহত হন এবং শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। প্রতিবাদে পরদিন সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করা হয়।
স্মরণে ২৮ অক্টোবর
দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির নানা কর্মসূচি নিয়েছে। সারাদেশে মহানগর, জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে সভা, বিক্ষোভ মিছিল, আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে লগি-বৈঠা তাণ্ডবের আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তরের উদ্যোগে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।
লগি-বৈঠা নিয়ে ঢাকা অবরোধের নির্দেশ
২০০৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পল্টন ময়দানের সমাবেশ থেকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তার কর্মীদের লগি-বৈঠা নিয়ে ঢাকা অবরোধের আহ্বান জানান। ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৪ দলীয় জোটের কর্মীরা ২৭ অক্টোবর থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশে ত্রাস সৃষ্টি করে। মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগের সভাস্থল থেকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল—“জামায়াত-শিবিরের ওপর হামলা কর, ওদের খতম কর।”
১৪ দলের নেতা আবদুল জলিল, তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক, মায়া, ইনু, রাশেদ খান মেননসহ অনেকে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের উৎসাহিত করেন।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহ
২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তার পরপরই শুরু হয় লগি-বৈঠা বাহিনীর তাণ্ডব। বিএনপি ও জামায়াত অফিস, বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বহু স্থাপনা। প্রথম হামলার শিকার হয় গাজীপুরে জামায়াতের অফিস, যেখানে শহীদ হন রুহুল আমিন।
বিকেল ৩টায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরের নির্ধারিত সমাবেশ ছিল। সকাল থেকেই মঞ্চ তৈরির কাজ চলছিল। হঠাৎ বেলা ১১টার দিকে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারীরা হামলা চালায়। তারা একযোগে বিজয়নগর, তোপখানা রোড ও মুক্তাঙ্গন থেকে আক্রমণ করে। নিরস্ত্র জামায়াত-শিবির কর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলায় মুহূর্তেই আহত হয় বহু মানুষ। পুলিশ তখন নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
পল্টন মোড়ে নৃশংসতা
পল্টন মোড়ে লগি-বৈঠা বাহিনীর তাণ্ডব ছিল অকল্পনীয়। তারা শিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম ও জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিনকে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে, পরে লাশের ওপর নৃত্য করে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিজয়নগর, পুরানা পল্টনসহ আশপাশের গলিতে ঢুকে নিরস্ত্র মানুষকে পেটাতে থাকে।
সেদিনের টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা ডা. এইচবিএম ইকবাল তার অনুসারীদের নির্দেশ দিচ্ছেন হামলার জন্য। নির্দেশের পরই এক যুবককে ঘিরে ধরে নির্মমভাবে পেটানো হয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশের ওপর নৃত্য করা হয়।
দুপুর ২টা পর্যন্ত হামলা চলতে থাকে, পুলিশ কিছুই করেনি। দুপুরের পর জামায়াতের সমাবেশ শুরু হলেও মাঝে মাঝে ছাদ থেকে বোমা ও গুলি ছোঁড়া হয়। বিকেল ৪টা ৪৩ মিনিটে নির্মাণাধীন র্যাংগস টাওয়ারের ছাদ থেকে আবারও বোমা নিক্ষেপ করা হয়, গুলি চলে। পরে বিডিআর এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
লাশ নিয়ে রাজনীতি ও পুলিশের ভূমিকা
হামলায় নিহত জামায়াত কর্মী হাবিবুর রহমানের লাশ নিয়েও রাজনীতি হয়। আওয়ামী লীগের কর্মীরা নকল বাবা-মা সাজিয়ে লাশটি দখলের চেষ্টা করে। পরে ধরা পড়লে তারা পালিয়ে যায়। এরপর আওয়ামী লীগ হাবিবুর রহমানকে নিজেদের কর্মী দাবি করে তার ছবিতে পোস্টার ছাপায়।
ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। পুলিশের উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারীরা হামলা চালায়, কিন্তু তারা কোনো বাধা দেয়নি। এমনকি লগি-বৈঠা বহন নিষিদ্ধের ঘোষণা থাকলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ঘটনার পরদিন জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ.টি.এম সিরাজুল হক বাদী হয়ে পল্টন থানায় মামলা করেন। ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জন আওয়ামী ও ১৪ দলীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেন। কিন্তু পরদিনই “অধিকতর তদন্তের” নামে পরোয়ানা স্থগিত করা হয়।
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে “জনস্বার্থে” মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো হত্যা মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করার সুযোগ নেই—এটি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যা ছিল আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রকাশ। রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি চিরকাল কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।
এনএইচ