উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বর্তমানে ১০০ শয্যার ভবনে পরিচালিত হলেও সরকারি অনুমোদন রয়েছে মাত্র ৫০ শয্যার। ফলে রোগীর চাপের তুলনায় জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন। এছাড়া নিয়মিত শতাধিক রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। ২৪ ঘণ্টা খোলা জরুরি বিভাগেও বিপুল সংখ্যক রোগী সেবা নিতে আসেন। শুধু চরফ্যাশন নয়, পার্শ্ববর্তী দ্বীপ উপজেলা মনপুরা থেকেও অসংখ্য রোগী এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন।
হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর পিতা সবুজ খান জানান, তার চার মাস বয়সী সন্তান হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ দিন ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, “পর্যাপ্ত ডাক্তার না থাকায় রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাচ্ছেন না। হাসপাতালের টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানিরও সংকট রয়েছে। আমার সন্তানের অবস্থার তেমন উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার চিন্তা করছি।”
শিক্ষক ও সমাজ সেবক মিজান মুনসী জানান, চরফ্যাশন হাসপাতালে কোন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। যার ফলে শিশুদের কোন সমস্যা হলে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ নদী পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা কিংবা বরিশাল যেতে হয়।অনকে সময় পথেও মৃত্যুরকোলে ঢলে পড়ে অনেক শিশু রোগীরা।
বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক ও অমানবিক উল্লেখ করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রাইটস ফর কোস্টাল পিপল (আরসিপি) এর চেয়ারম্যান রেদওয়ানুল হক বলেন, দেশে চিকিৎসক সংকট আছে এটা ঠিক, এর মধ্যেও উপকূলের মানুষের চিকিৎসা সেবাকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এখানের মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে যেতে পারেন না। তাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিপুল সংখ্যক মানুষ যদি ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত হন সেটি হবে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে এই বাস্তবতা তুলে ধরে অবিলম্বে ডাক্তার সংকট দূর করতে হবে।
চরফ্যাশন আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট রমিজ উদ্দিন বলেন, এত বড় একটা হাসপাতালে শিশু, কার্ডিওলজিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে কোনো কনসালট্যান্ট নেই, যার কারণে কার্ডিয়াক অনেক রোগী লঞ্চে করে ঢাকায় যাওয়ার পথে লঞ্চে মৃত্যুর রেকর্ডও কম নয়।
চরফ্যাশন সাংবাদিক ইউনিয়নের আহবায়ক অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান বলেন, চিকিৎসক ও কনসালট্যান্ট সংকট পূরণ হলে, লাখ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাবে। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক নিয়োগ করা প্রয়োজন।
চরফ্যাশন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মনজুর হোসেন বলেন, চরফ্যাশন হাসপাতালে চিকিৎসক ও কনসালট্যান্ট সংকটের বিষয়টি ভোলা - ৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়নকে অবহিত করেছি, বিষয়টি তিনি বিশেষ ভাবে দেখছেন।
চরফ্যাশন উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ মীর মোহাম্মদ শরীফ হোসাইন বলেন, চরফ্যাশনের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক নিয়োগ করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি করছি।
প্যাথলজি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক পরীক্ষা হাসপাতালের বাইরে করাতে হচ্ছে, যার ফলে রোগীদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। বিভাগটিতে সেল কাউন্টার (ব্লাড কাউন্ট) মেশিন, ল্যাব রোটেটর, আধুনিক মাইক্রোস্কোপ, রেফ্রিজারেটর, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন এবং বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে অনেক পরীক্ষা পুরোনো মাইক্রোস্কোপিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মাকলুকুর রহমান বলেন, “৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য ৪২ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন মাত্র ১৬ জন। এছাড়া ১০ জন কনসালট্যান্ট থাকার নিয়ম থাকলেও রয়েছেন এনেস্থিসিয়া ও
অর্থোপেডিক দুই জন। জনবল সংকটের কারণে রোগীদের প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: শোভন বসাক বলেন,জনবল সংকট থাকার পরও আমাদের চিকিৎসকগণ সাধ্য মতে নিরলস ভাবে জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করে যাচ্ছে।
চিকিৎসা সেবা প্রত্যাশীরা বলছেন, চরফ্যাশনের বিশাল জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে দ্রুত চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধি করা হোক।
এমএম