পানিমগ্ন নগরের অলিগলি: স্থবির জনজীবন
সোমবার সকাল হতেই নগরের নিচু এলাকাগুলোতে পানি দ্রুত জমতে শুরু করে। নগরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা এবং কাতালগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়। অনেক দোকানে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। রিয়াজুদ্দিন বাজার ও চকবাজারের মতো পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে থমকে গেছে বিকিকিনি।
নগরের অন্যতম প্রধান সড়ক সংযোগ ‘আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার’-এ দেখা গেছে এক নজিরবিহীন দৃশ্য। ফ্লাইওভারের ওপর পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে কৃত্রিম জলজট। জল নিষ্কাশনের নালা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পানি নামতে না পেরে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির চাকা থেকে দুই পাশে সজোরে পানি ছিটকে নিচে পথচারীদের ওপর পড়ছে, যা এক অদ্ভুত ও দুর্ভোগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত, আবহাওয়া অফিসের সতর্কবার্তা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা অত্যন্ত বেশি। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কেবল সকাল ৬টা থেকে ৯টা—এই তিন ঘণ্টাতেই বৃষ্টি হয়েছে ৮১ মিলিমিটার। তিনি আরও সতর্ক করে জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামে আগামী আরও ২ থেকে ৩ দিন ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
অন্যদিকে, নগরীর আমবাগান আবহাওয়া অফিসের অফিসার ইনচার্জ বিজয় রায় জানান, তাঁদের কেন্দ্রে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সকালের তিন ঘণ্টাতেই ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি জমেছে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ফলেই শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত যানবাহন ও গ্যাস সংকট
একদিকে রাস্তায় জমে থাকা হাঁটু পানি, অন্যদিকে গণপরিবহনের তীব্র সংকট-দুয়ে মিলে চট্টগ্রামবাসীর সোমবার সকালের পথচলা রূপ নেয় এক দুঃস্বপ্নে। রাস্তায় প্রধান পরিবহন মাধ্যম সিএনজিচালিত অটোরিকশার উপস্থিতি ছিল একেবারেই নগণ্য। নগরে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে অধিকাংশ সিএনজি অটোরিকশা সোমবার সকালে রাস্তায় নামতে পারেনি। ফলে সাধারণ যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
কাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মানুষকে হাঁটু পানি টপকে ও দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা যায়। রাইড শেয়ারিং অ্যাপভিত্তিক গাড়ি ও রিকশাচালকরা গুণছেন কয়েকগুণ বেশি ভাড়া।
ভোগান্তির চিত্র: স্থানীয়দের ক্ষোভ ও আর্তনাদ
নগরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ বাসিন্দারা।
রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা খাদিজা জান্নাত সুজন হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, "রবিবার রাত থেকে একনাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। সকালে দরজার বাইরে বের হয়ে দেখি রাস্তায় পানি আরও বেড়ে গেছে। হাঁটুসমান ময়লা পানি মাড়িয়ে কাজে যেতে হচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই আমাদের এই একই নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের কথা শুনি, কিন্তু বাস্তবে স্থায়ী কোনো সমাধান পাচ্ছি না।"
বাকলিয়ার বাসিন্দা ফকরুল আলম জানান, "সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে কোনো গাড়ি পাচ্ছিলাম না। রাস্তায় অতল পানি, তার ওপর গাড়ির আকাল। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তিন গুণ সময় লাগছে। পানির কারণে অনেক গাড়ি বিকল হয়ে রাস্তায় আটকে আছে।"
বহদ্দারহাটের চাকরিজীবী এস এম গিয়াস উদ্দিন বলেন, "সড়কে কাঁদা আর নোংরা পানি জমে থাকায় হেঁটে যাওয়াও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ম্যানহোল খোলা আছে কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা। তাদের ভেজা কাপড় ও বই-খাতা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।"
উপজেলাগুলোতেও প্লাবন: বোয়ালখালীতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
কেবল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা নয়, আশপাশের উপজেলাগুলোতেও ভারী বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। বিশেষ করে বোয়ালখালী উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতি বেশ আশঙ্কাজনক।
বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর-সাতগড়িয়াপাড়া এলাকায় পুরো বর্ষাজুড়েই জমে থাকা পানি ভারী বর্ষণে আরও রূপ নিয়েছে স্থায়ী প্লাবনে। সেখানকার প্রধান প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। বোয়ালখালীর অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে পানি জমে থাকায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য বের হওয়া গ্রামীণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থায়ী সমাধানের আকুল দাবি নগরবাসীর
বছরের পর বছর ধরে বর্ষা মৌসুম এলেই চট্টগ্রাম নগরের এই জলাবদ্ধতা নিত্যদিনের সঙ্গীতে পরিণত হয়। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কেন সামান্য থেকে মাঝারি বৃষ্টিতে পুরো শহর এভাবে ডুবে যাচ্ছে, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ জমছে সচেতন মহলে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নালা-নর্দমা থেকে পলি অপসারণ, খালের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দ্রুত ও সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান চান ভুক্তভোগী চট্টগ্রামবাসী।
এমএম