সোমবার (১৭ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার অধীনে আসবে অটোরিকশা
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, "সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোকে আমরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরাসরি সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভার নিবন্ধনের (রেজিস্ট্রেশন) আওতায় নিয়ে আসছি। সেখানেই সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে প্রধান শর্ত হলো—অটোরিকশার ব্যাটারিতে যে চার্জ দেওয়া হবে, তা অবশ্যই সৌরবিদ্যুৎ থেকে হতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যতিরেকে অন্য কোনো অবৈধ বা গ্রিড লাইনের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, পরিবেশ ও জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে সরকার এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কোনো চালক বা গ্যারেজ মালিক এই নির্দেশ অমান্য করলে একদিকে যেমন জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে, অন্যদিকে তাঁদের গাড়ির নিবন্ধন বা লাইসেন্স সাথে সাথেই বাতিল বা স্থগিত করা হবে।
নিবন্ধনে পরিবর্তন: বিআরটিএ নয়, লাইসেন্স দেবে স্থানীয় সরকার
অটোরিকশার লাইসেন্স ও নিবন্ধন প্রদানের দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার নিরসন ঘটিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন এখন আর বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএ (BRTA) দেবে না। এর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট এলাকার সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভাগুলো সরাসরি এই নিবন্ধন প্রদান ও তদারকির দায়িত্ব পালন করবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, "জাতীয় সংসদে ইতোমধ্যেই এই সংক্রান্ত আইন পাস হয়েছে। বর্তমানে সেই পঠিত আইনের আলোকে একটি বাস্তবসম্মত ও আধুনিক বিধিমালা তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। খুব শিগগিরই চূড়ান্ত হতে যাওয়া এই নতুন বিধিমালায় অটোরিকশার নিবন্ধন ফি, বার্ষিক নবায়ন ফি, নিরাপত্তা বিধি এবং সার্বিক পরিচালনার অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।"
ফিটনেস সনদে বুয়েট ও পলিটেকনিক্যালের বাধ্যবাধকতা
কেবল সৌরবিদ্যুতের শর্তই নয়, অটোরিকশার কারণে সড়কে ক্রমাগত ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা রোধ ও যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফিটনেস সনদের ক্ষেত্রেও যুক্ত করা হয়েছে অত্যন্ত কঠোর নিয়মাবলী। নিবন্ধনের জন্য অটোরিকশার কারিগরি উপযোগিতা যাচাই করা হবে পেশাদার প্রকৌশলীদের মাধ্যমে।
মীর শাহে আলম বলেন, "ব্যাটারিচালিত রিকশার সঠিক ফিটনেস নিশ্চিত করতে নিবন্ধন ও নবায়নের আবেদনের সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অথবা জেলা পর্যায়ের সরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। এই কারিগরি পরিদর্শন ছাড়া কোনো গাড়িকেই উপযুক্ত ধরা হবে না।"
তিনি উদ্ধার ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধাপ ব্যাখ্যা করে জানান, বুয়েট বা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে কারিগরি ফিটনেস সনদ নেওয়ার পর, উক্ত নথিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রতিস্বাক্ষর (Countersign) নিতে হবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সেটি সিটি করপোরেশন বা পৌরসভায় জমা দিতে হবে। পুলিশ ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের যৌথ সবুজ সংকেত পেলেই কেবল একটি অটোরিকশা চলাচলের আইনি বৈধতা বা লাইসেন্স লাভ করবে।
জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাবে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডের বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এর ফলে দেখা দেয় মারাত্মক বিদ্যুৎ সংকট ও রাজস্ব ঘাটতি। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশজুড়ে অটোরিকশা গ্যারেজগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপনের জোয়ার আসবে। এটি যেমন গ্রিডের ওপর থেকে বিদ্যুতের চাপ কমাবে, তেমনি পরিবেশবান্ধব গ্রিন এনার্জির ব্যবহার বৃদ্ধিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
একই সাথে ট্রাফিক পুলিশের প্রতিস্বাক্ষর ও বুয়েট/পলিটেকনিকের ফিটনেস সনদের বাধ্যবাধকতা থাকায় নিম্নমানের ও অনিরাপদ অটোরিকশা সড়ক থেকে একপ্রকার দূর হবে। সরকারের এই যুগপৎ উদ্যোগকে দেশের পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং টেকসই সবুজ জ্বালানি ব্যবহারের এক বড় মাইলফলক বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এমএম