এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ের অধিকাংশ খামারি ঝরে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তখন দেশের পোল্ট্রি শিল্প সীমিত কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, যার প্রভাব পড়বে ডিমের দাম, কর্মসংস্থান এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর।

সংকট মোকাবিলায় সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্বল্পসুদে ঋণ, ফিড ও ভ্যাকসিনে ভর্তুকি, জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং জাতীয় পোল্ট্রি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়েছেন খামারিরা।

শনিবার (১১ জুলাই) রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর আহমেদ চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)। সংবাদ সম্মেলনের আগে সারাদেশের পোল্ট্রি খামারিদের ১১ দফা দাবি আদায়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন খামারিরা। এ সময় তারা প্রতিবাদের অংশ হিসেবে পথচারীদের মধ্যে সিদ্ধ ডিম বিতরণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিপিআইএর সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশের হাজার হাজার ডিম উৎপাদনকারী খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতি দিনই তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন, ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন এবং অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিপিআইএ সভাপতি বলেন, বর্তমানে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা একটি ডিম উৎপাদনে ১০ টাকা ২০ পয়সা থেকে সাড়ে ১০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করছেন। অথচ সেই ডিমই তাদের ছয় টাকা থেকে সাড়ে ছয় টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিটি ডিমে প্রায় চার টাকা করে লোকসান হচ্ছে। দেশে প্রতিদিন প্রায় ছয় কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। সেই হিসাবে প্রতি দিন প্রায় ২৪ কোটি টাকা এবং মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন খামারিরা।

মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন না। তখন পুরো পোল্ট্রি শিল্প কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস ডিমের দাম বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একইসঙ্গে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়বে।

পোল্ট্রি খামারিদের এই নেতা বলেন, পোল্ট্রি শিল্পকে টেকসই করতে হলে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি খামারিদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা, ফিড ও ভ্যাকসিনে ভর্তুকি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।

পোল্ট্রি খাতে যৌক্তিক মূল্য বা ফেয়ার প্রাইস নির্ধারণের দাবি জানিয়ে বিপিআইএর সভাপতি বলেন, উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন। উৎপাদক টিকে না থাকলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়বে।

মোশাররফ হোসেন বলেন, সারা দেশের পোল্ট্রি খামারিদের নিয়ে একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ গড়ে তুলতে হবে। এতে প্রকৃত খামারিদের সহজে শনাক্ত করা যাবে, কতজন খামারি ঝরে পড়ছেন তা জানা যাবে এবং উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ প্রকৃত খামারিদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।

বিপিআইএ সভাপতি বলেন, দেশে মাছ, মুরগির বাচ্চা, ওষুধ, টিকা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে পোল্ট্রি শিল্পের মূল চালিকাশক্তি প্রান্তিক খামারিরাই সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন। গত পাঁচ বছরে এই খাত থেকে ৬৪ হাজার খামারি ঝরে পড়েছেন বলেও তিনি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে বিপিআইএর মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, একটি পোল্ট্রি খামারের মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই চলে যায় খাদ্যের পেছনে। অথচ খাদ্যের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এখনো ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিতে হচ্ছে। বহুদিন ধরেই এই কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে কৃষিখাতের কাঁচামালের ওপর এমন কর ব্যবস্থা নেই। ফলে বাংলাদেশের খামারিরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

সাফির রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব থাকায় পোল্ট্রি খাত কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না। তাই সরকার, খামারি, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় পোল্ট্রি বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন। উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলে আগামী এক দশকের মধ্যে পোল্ট্রি খাত দেশের অন্যতম সফল শিল্পে পরিণত হতে পারে।

যখন খামারিরা লোকসান দিয়ে সাড়ে চার টাকা দরে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখনও ভোক্তাকে সেই ডিম কিনতে হয় সাড়ে ১০ টাকায়

সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, যখন খামারিরা লোকসান দিয়ে সাড়ে চার টাকা দরে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখনও ভোক্তাকে সেই ডিম কিনতে হয় সাড়ে ১০ টাকায়। ডিম একটি দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য হওয়ায় খামারিরা তা মজুত করে রাখতে পারেন না। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

অঞ্জন মজুমদার নিবন্ধিত খামারিদের জন্য ‘ফার্মার আইডি’ চালু, প্রান্তিক খামারিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ, পোল্ট্রি বিমা চালু, উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য পোল্ট্রি খামারঘন এলাকায় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও খামারি সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ‘বাংলাদেশ জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ গঠনের দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন বিপিআইএর উপদেষ্টা এনসি বনিক, সহসভাপতি মেজবাউর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, প্রচার সম্পাদক সফিকুর রহমান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক গাজী নূর হোসেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুন্না মুন্সীসহ সংগঠনের নেতারা।

এমএম