তবে এই ইতিবাচক সংকেতের পাশাপাশি জনশক্তি খাতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে নিয়োগকারী এজেন্সি এবং মেডিকেল সেন্টারের তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে। মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং ৪০টিরও বেশি মেডিকেল সেন্টারের অনুমোদন দিলে দেশে 'সিন্ডিকেট' ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি নিয়ে সরব হয়ে উঠেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
মালয়েশিয়া সরকারের ঘোষিত কর্মী নিয়োগের ৮ ধাপ
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বিদেশি কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল এবং আইনানুগভাবে সম্পন্ন হতে হবে। নিয়োগকারী মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মী মালয়েশিয়ায় পৌঁছানো পর্যন্ত আটটি মৌলিক ধাপ অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
প্রথম ধাপ (চাহিদা অনুমোদন ও বিজ্ঞাপন): নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা নিয়োগকর্তাকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কর্মী নিয়োগের প্রাথমিক অনুমোদন নিতে হবে। এরপর মালয়েশিয়ার সরকার-নির্ধারিত নির্দিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খালি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।
দ্বিতীয় ধাপ (কোটা আবেদন ও সরাসরি সাক্ষাৎকার): শূন্য পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ সেন্টারে (OSC) প্রয়োজনীয় বিদেশি কর্মীর কোটার জন্য আবেদন করতে হবে। অনলাইনে সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার পর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে এবং সার্বিক মূল্যায়নের পর কোটা অনুমোদনের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
তৃতীয় ধাপ (লেভি ও সরকারি ফি প্রদান): কোটা অনুমোদন পাওয়ার পর নিয়োগকর্তাকে দ্রুত নির্ধারিত লেভি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে। পুরো এই প্রক্রিয়াটি মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ এবং তাদের নিজস্ব 'মাইআইএমএমএস' (MyIMMS) ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে পরিচালিত হবে।
fourth/চতুর্থ ধাপ (শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনপত্র সংগ্রহ): লেভি জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হলে নিয়োগদাতা মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ সেন্টার থেকে নিয়োগসংক্রান্ত শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনপত্র সংগ্রহ করবেন।
পঞ্চম ধাপ (দূতাবাসের আনুষ্ঠানিকতা): নির্দেশনার এই পর্যায়ে কর্মীর নিজ দেশে অবস্থিত মালয়েশিয়ান দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে নির্ধারিত যাবতীয় প্রশাসনিক ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
ষষ্ঠ ধাপ (অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণ): নিজ দেশীয় প্রশাসনিক পর্ব শেষ হওয়ার পর কর্মী উৎস দেশ থেকে সরাসরি মালয়েশিয়ায় প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই কাজটি সম্পন্ন করতে হবে মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক অনুমোদিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি (RA) বা স্বীকৃত নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে।
সপ্তম ধাপ (ভিডিআর সংগ্রহ): বিদেশি কর্মীর জন্য আবশ্যক ভিসা উইথ রেফারেন্স (VDR) সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
অষ্টম ধাপ (মালয়েশিয়ায় প্রবেশ ও যোগদান): শেষ ধাপে বিদেশি কর্মী আইনসম্মতভাবে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করবেন এবং নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করবেন। কর্মীর আগমনের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটবে।
মালয়েশিয়ার বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যেকোনো তথ্য বা অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা জানতে সংশ্লিষ্টদের বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সরকারি পোর্টাল 'ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম' বা এফডব্লিউসিএমএস (FWCMS) ব্যবহার করতে হবে।
২৫ এজেন্সি ঘিরে ‘সিন্ডিকেট’ বিতর্ক ও বায়রার প্রতিক্রিয়া
মালয়েশিয়া সরকারের এই নির্দেশনার পরপরই বাংলাদেশে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে নির্ধারিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নির্বাচন নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, পূর্বের সিন্ডিকেটের একটি প্রভাবশালী অংশ নতুন মোড়কে আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, "তালিকাভুক্ত এজেন্সির অধিকাংশকেই দেশের জনশক্তি খাত চেনে না। এগুলো মূলত ২/৩টি প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবই ডামি এজেন্সি, যেগুলোর নেপথ্যে বিগত দিনের বিতর্কিত সিন্ডিকেটের সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের এই অনৈতিক প্রভাব ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণেই অতীতে বারবার শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
এ নিয়ে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিষযটি পর্যালোচনা শুরু করে এবং মালয়েশিয়া সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যার জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়।
সরকারের অবস্থান ও আশার বাণী
উদ্ভূত বিতর্কের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমবাজার স্বাভাবিক করার সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়েছেন, দুই দেশের সরকারই একটি স্বচ্ছ ও সুন্দর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রমবাজার পুনরায় সক্রিয় করতে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, "আমরা নিশ্চিত করছি যে এবার মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গোপনীয়তা কিংবা অসাধু সিন্ডিকেটের উপস্থিতি সহ্য করা হবে না। প্রতিটি সাধারণ কর্মী ও বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি যাতে সমান ও নিয়মমাফিক সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আশা করছি খুব দ্রুতই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার ঘোষণা মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আসবে।"
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনও সম্প্রতি জানিয়েছিলেন যে, প্রক্রিয়াটি দ্রুত বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং শিগগিরই বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু করবে। যদিও নির্দিষ্ট তারিখের অপেক্ষায় রয়েছে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশন ও ঢাকা।
শ্রমবাজারের প্রেক্ষাপট ও অতীত ইতিহাস
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া চতুর্থ বৃহত্তম গন্তব্য। তবে নানা অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া ভিসা এবং দুর্নীতির কারণে এই শ্রমবাজারটি বারবার হোঁচট খেয়েছে।
২০২১ সালে উভয় দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়, যার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। তবে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার জের ধরে ২০২৪ সালের জুন থেকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কর্মী নেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়ার তৎকালীন সরকার। বর্তমান বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে এই শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি সর্বোচ্চ প্রাধান্য পায়।
ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগের পর অবশেষে এই ৮ ধাপের স্বচ্ছ নীতিমালা প্রকাশের মাধ্যমে অচলাবস্থা কাটার বার্তা দিল মালয়েশিয়া। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল সিন্ডিকেটমুক্ত রেখে সাধারণ কর্মীদের হয়রানি ছাড়া কত দ্রুত ও দক্ষতার সাথে এই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে পারে।
এমএম