বালোচিস্তান কি সত্যিই পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে? এমন প্রশ্ন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ‘রিপাবলিক অব বালোচিস্তান’ নামে প্রকাশিত একটি বিবৃতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বালোচিস্তান নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে।
একই সঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অঞ্চলটির প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার বলছে এ সংবাদটি ডাহা মিথ্যা। ভারতীয় গণমাধ্যমের অপপ্রচার ছাড়া কিছুই না।
এসব দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল কতটা? বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ কি সত্যিই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে? পাকিস্তান কি ভেঙে যাওয়ার পথে?
পাকিস্তানের শীর্ষ গণমাধ্যম ডন ও জিও নিউজ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা আল জাজিরা, রয়টার্স ও এপিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে গুরুতর। কয়েক দশকের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত এখন আরও সংগঠিত, প্রাণঘাতী ও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত বালোচিস্তান পাকিস্তান থেকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কিংবা বিএলএ প্রদেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
বরং বালোচিস্তানের ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার বড় অংশের উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বিবৃতি, পোস্ট ও অযাচাইকৃত দাবি।
এগুলোর সঙ্গে বিএলএর সশস্ত্র তৎপরতা এবং দীর্ঘদিনের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকে মিলিয়ে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, পাকিস্তানের ভাঙন বুঝি আসন্ন। বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বালোচিস্তান আবারও বড় ধরনের সহিংসতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলা, নিরাপত্তা সদস্যদের অপহরণ ও হত্যা এবং পাল্টা সামরিক অভিযানে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
আসলে গত এক সপ্তাহ ধরে বিচ্ছিন্নতাকামী শক্তিকে দমন করতে বালোচিস্তানে সেনা অভিযান চালাচ্ছে পাকিস্তান। সেনা অভিযানে সেখানে ৭৫ জন বিচ্ছিন্নতাকামী নিহত হয়েছেন।
নিহতরা সন্দেহভাজন জঙ্গি, নিষিদ্ধ বালোচ লিবারেশন আর্মি নামে সশস্ত্র সংগঠনের সদস্য বলে দাবি পাকিস্তানের। বালোচিস্তান সরকার গোপন অভিযানের কথা খোলসা করেছে।
এ সব বিচ্ছিন্নতাকামীরা পাাকিস্তানে হামলা করে আফগানিস্তানে পালিয়ে যায় বলে সীমান্তে পাকিস্তান বিমান হামলা চালিয়েছে। আফগানিস্তানের তালিবান প্রশাসন দাবি করেছে, পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত ইসলামিক স্টেট (আএস) খোরাসান-এর সন্দেহভাজন ঘাঁটিগুলিতে এয়ার স্ট্রাইক করেছে।
এই ঘটনায় দুই দেশের সীমান্তে নতুন করে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মূলত পাকিস্তানের বালোচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় এয়ার স্ট্রাইক করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
আয়তনের দিক দিয়ে পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ প্রদেশ বালোচিস্তান, লোকসংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ। ২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ২৪ কোটি। বালোচিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ। সেখানে তেল, কয়লা, সোনা, তামা ও গ্যাসের খনি রয়েছে।
এরপরও পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল এটি। পাকিস্তান সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস বালোচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ এই প্রদেশের বাসিন্দাদের কঠোর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিন যাপন করতে হয়। পাকিস্তানের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দরও বালোচিস্তানে, গোয়াদার সমুদ্রবন্দর। ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্প মূলত এই সমুদ্রবন্দর ঘিরেই গড়ে উঠেছে।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিম চীন এবং আরব সাগর দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সংযোগ গড়ে তোলা। বালোচিস্তান প্রদেশের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পাকিস্তান সরকার খুবই কৌশলে ক্রমাগত তাদের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে যাচ্ছে এবং তাদের সম্পদের অপব্যবহার করছে।
এর ফলে তাদের মধ্যে (সরকার দ্বারা) প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি গড়ে উঠেছে এবং তাদের সমর্থন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। পাকিস্তান বরাবরই এখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভারত উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে। এতে একমত চীন ও আমেরিকাও। আমেরিকা প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছে, বালোচিস্তানে অশান্তি সৃষ্টি করছে ভারত।
বালোচিস্তান হলো ইরানীয় মালভূমির পাশে অবস্থিত একটি বিশাল শুষ্ক ও পার্বত্য অঞ্চল, যা ইরান ও আফগানিস্তানের সীন্তান্তে অবস্থিত।
দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের এই প্রদেশের পশ্চিমে ইরান, উত্তরে আফগানিস্তান, দক্ষিণে আরব সাগর এবং পূর্বে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশ অবস্থিত। পাহাড়ি এই প্রদেশটি ঘিরেই এখন বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি পাকিস্তানে।
ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিশেষ করে নিউজ১৮ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘রিপাবলিক অব বালোচিস্তান’ নামে একটি সংগঠনের প্রকাশিত বিবৃতিতে বালুচিস্তানের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, নতুন মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। তবে দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
বিবৃতিতে দাবি করে বলা হয়, বালোচিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং নিজেদের জাতীয় সংগীত "মা চুকাইন বালুচানি" ও জাতীয় পতাকা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে তারা "বালোচি ফালুস" নামে নিজস্ব মুদ্রা চালু করেছে এবং বালুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। নতুন প্রশাসন ওই অঞ্চলের খনিজ সম্পদ, গ্যাসক্ষেত্র এবং কয়লাখনিগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এই অগ্রগতি বালোচিস্তানকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির যোগ্য করে তুলেছে। আমরা এখন এই প্রজাতন্ত্রের সোনা ও তামার খনি, ১৫০টিরও বেশি সক্রিয় গ্যাসক্ষেত্র এবং ১ হাজার ২০০টিরও বেশি সচল কয়লাখনি নিয়ন্ত্রণ করছি।’
এতে আরও দাবি করা হয়, ‘পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করে বালোচ পক্ষে যোগ দিয়েছেন। আজ আমরা আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে বালোচিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। আমাদের হয়তো যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা ভারী কামান নেই, কিন্তু আমরা আমাদের ভূমি নিয়ন্ত্রণ করি। বালোচিস্তানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসন নিয়ে গঠিত ৫ লাখ সদস্যের একটি বাহিনী পাকিস্তানের দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে দিতে প্রস্তুত।’
স্বঘোষিত ‘রিপাবলিক অব বালুচিস্তান’ আরও দাবি করেছে, ওই অঞ্চলের মানুষ পাকিস্তানে তাদের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। দিন দিন বিপুলসংখ্যক বালোচ ও পশতুন সেনাসদস্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফ্রন্টিয়ার কোর (এফসি) এবং লেভিস থেকে পদত্যাগ করছেন।
বালুচ গোষ্ঠীটি জানায়, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি বার্তা যে বালোচিস্তানকে এখন থেকে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীকে বালুচিস্তানের ভূমি, আকাশসীমা বা উপকূলরেখা ব্যবহার করে এ অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বালুচিস্তানের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, এই স্বীকৃতি এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে।
এদিকে, বালোচ নেতা মীর ইয়ার বালুচ একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বালোচিস্তানের সাধারণ মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে এবং তাদের অবিলম্বে এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার দাবি জানাচ্ছে।
মীর ইয়ার বালুচ বলেন, ‘বালোচিস্তান প্রজাতন্ত্রের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বালুচদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে এবং এখন তারা কেবল বিমানবাহিনীর ওপর নির্ভর করছে। এখন সশস্ত্র যোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ বেসামরিক মানুষও প্রতিরোধে শামিল হচ্ছে এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে বালোচিস্তান খালি করার নির্দেশ দিচ্ছে।’
বালোচিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা ও একের পর এক বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীরা প্রায়ই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে আসছেন।
তবে এই ভাইরাল চিঠির বিষয়ে এখন পর্যন্ত পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মূলত চলতি জুলাইয়ে বেলুচিস্তানে কয়েকটি বড় হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, ৬ জুলাই থেকে কয়েক দিনের মধ্যে তিনটি বড় হামলায় অন্তত ৪২ জন পুলিশ ও সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
এরমধ্যে জিয়ারাত অঞ্চলের মাঙ্গি বাঁধের কাছে একটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে অপহৃত ১৮ পুলিশ সদস্যের মরদেহ পাওয়া যায়। পৃথক আরেক হামলায় নিহত হন ১১ সেনাসদস্য।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী এরপর বালোচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর ও পুলিশ যৌথভাবে এসব অভিযানে অংশ নেয়।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, কয়েক দিনের অভিযানে বহু সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবে সংঘাতপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত হওয়ায় উভয় পক্ষের হতাহতের দাবি আলাদাভাবে যাচাই করা কঠিন।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফ চৌধুরী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বলেছেন, ‘আমরা তোমাদের ধাওয়া করব, আমরা তোমাদের আঘাত করব।’
তার বক্তব্যে স্পষ্ট, ইসলামাবাদ বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
তবে এবারের সহিংসতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে বিএলএ ও অন্য বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো হামলার পরিধি বাড়িয়েছে। তারা সামরিক ঘাঁটি, পুলিশ স্টেশন, মহাসড়ক, রেলপথ, সরকারি স্থাপনা এবং চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
বড় শহরের বাইরে প্রত্যন্ত এলাকায় সাময়িকভাবে সড়ক অবরোধ, তল্লাশিচৌকি স্থাপন কিংবা ছোট শহরে প্রবেশ করে হামলা চালানোর ঘটনাও ঘটেছে।
তবে, পাকিস্তানের এ প্রদেশটিতে ভারতের নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ আমুলক নায়। ইরান থেকে পাকিস্তানে ঢোকার পর গুপ্তচরবৃত্তি ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের অভিযোগে ২০১৬ সালের ৩ মার্চ বালোচিস্তান প্রদেশ থেকে কুলভূষণ নামে এক ভারতীয় গুপ্তচরকে গ্রেফতার করে পাক নিরাপত্তা বাহিনী।
তার পর ২০১৭ সালের এপ্রিলে কুলভূষণকে মৃত্যুদণ্ড দেয় পাক সামরিক আদালত। ওই সময় ভারতের তরফে জানানো হয়, নৌবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর ইরানে ব্যবসায়িক কাজে গিয়েছিলেন কুলভূষণ। সেখান থেকে তাকে অপহরণ করা হয়।
গত কয়েক বছর বেলুচিস্তানে বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বেসামরিক মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে সেই হামলা হয়। এর আগে চীনের নাগরিক ও চীনা প্রকল্পগুলোতে বেশ কয়েকটি হামলা হয়েছে। এখন পাঞ্জাব থেকে আসা মানুষদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, বালোচিস্তানে বহিরাগত ব্যক্তিরা নিরাপদ নন।
আগে বিএলএ মূলত ব্যক্তিগত হামলা বা পাইপলাইন ধ্বংসের মতো ছোট আকারের হামলা চালাত। কিন্তু এখন তারা বৃহৎ পরিসরের সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। এর পিছনে ভারতের হাত আছে বলে দাবি করছে পাকিস্তান। এই গোষ্ঠী এখন যাত্রীবাহী ট্রেনের ওপর আক্রমণ চালানোর মতো বড় হামলা করছে।
বেলুচিস্তানবিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক রফিউল্লাহ কাকর জানান, বিএলএ তাদের কমান্ড কাঠামো আরও সংগঠিত করেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে যোদ্ধারা সরাসরি অপারেশন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন। তিনি আরও বলেন, শুধু গোয়েন্দা ব্যর্থতা থেকেই যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। এর মূল কারণ হচ্ছে, বালুচ নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের বাড়তে থাকা দূরত্ব।
কয়েক দশক ধরে বালোচিস্তান প্রদেশ সামরিক বাহিনীর হাতে যেন রাজনৈতিক পরীক্ষার ল্যাবরেটরি হয়ে আছে। গত ১০ বছরে ৬ জন মুখ্যমন্ত্রী বদল হয়েছে এখানে। এ অস্থিরতা গণতান্ত্রিকব্যবস্থা ধসিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্র আর নাগরিকের মধ্যে এই বাড়তে থাকা ব্যবধান থেকে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা।
তারা ব্যাপকভাবে তরুণদের দলে টানতে পারছে। বাড়ছে আত্মঘাতী হামলা। আর বালোচরা মনেই করেন যে রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করে না।
বালোচিস্তান প্রদেশে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ এবং আত্মঘাতী হামলা ভারত থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে দাবি করে পাকিস্তান। এ ব্যাপারে মুখ খোলে আমেরিকাও।
বালুচিস্তানে জঙ্গি হামলা নিয়ে বিবৃতি দেয় আমেরিকা। তাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিযানকে তারা সমর্থন করেছে। জানিয়েছে, বালোচিস্তানের বিষয়ে তারা পাকিস্তান সরকারের পাশেই আছে। নৃশংস হামলার নেপথ্যে যারা দায়ী, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিভাগ (ব্যুরো অফ সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স বা এসসিএ) সমাজমাধ্যমে লিখেছে, বালুচিস্তানে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসবাদী হামলার আবহে আমরা পাকিস্তানের পাশে আছি। আমাদের অবস্থান অনড়। বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) বিদেশি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃত এবং আমরা এই সব নৃশংস হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করি।
এই সংগঠনকে ২০২৫ সালের অগস্টেই আমেরিকা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসাবে ঘোষণা করেছিল। পাকিস্তানের দাবি, বালোচিস্তানে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের নেপথ্যে ভারতের হাত রয়েছে।
তাদের সেনাবাহিনী বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছিল, হামলা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বিদেশের মাটি থেকে। যদিও বক্তব্যের সপক্ষে কোনও প্রমাণ দেখাতে পারেনি পাকিস্তান। ভারত সরকার এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছে।
সশস্ত্র জঙ্গীদের পাশাপাশি মানবাধিকার কর্মীর লেবাসে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত দিতে বিভিন্ন পেশার গুপ্তচরকেও ভারত ব্যবহার করছে বলে পাকিস্তানের অভিযোগ।
বালোচিস্তান প্রদেশে বিচার-বহির্ভূত হেনস্থা, গ্রেফতারি এবং হত্যার অভিযোগে গত বছর মার্চে কোয়েটায় অবস্থান আন্দোলন শুরু করেছিলেন মাহরং এবং তার অনুগামীরা।
গত এক দশক ধরেই বালোচিস্তানে পাক ফৌজের অত্যাচারের, সাজানো সংঘর্ষে খুন, নিহতদের মৃতদের গায়েবের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। গ্রেফতার হয়েছেন বহুবার।
এবার সেই বালোচ মানবাধিকারকর্মী এবং বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (বিওয়াইসি)-র নেত্রী মাহরং বালোচ ও তার দুই সহযোগীকে কোয়েটার সন্ত্রাস দমন আদালত যাবজ্জীবন জেলের সাজা দিল।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে পেশায় চিকিৎসক মাহরং এবং তার সহযোগী সিভগাতুল্লা বালোচ ও বালাচ কাদিরকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বালোচরা আগে থেকে গোঁয়াড় একটা জাতি হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশরা পর্যন্ত তাদের কাছে নাকানি-চুবানি খেয়েছে। ‘পাঞ্জাবিদের শাসন করো, সিন্ধিদের ভয় দেখাও, পশতুদের টাকা দিয়ে কিনে নাও, আর বালোচদের সম্মান করো।’
ব্রিটিশরা এই নীতিতেই ভারতবর্ষ শাসন করত। তারা জানত, সব জাতিগোষ্ঠীকে একই নিয়মে বশে আনা যায় না। বিশেষ করে দুই গোষ্ঠীকে নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ছিল সবচেয়ে বেশি—পশতু আর বালোচ। তাদের দমানো সহজ নয়। তারা জন্মগতভাবেই বিদ্রোহী। কারও শাসন মানতে চায় না।
ব্রিটিশরা প্রথমে চেষ্টা করেছিল শক্তি দিয়ে দখল নিতে। কিন্তু ১৮৪২ সালে কাবুল থেকে তাদের সৈন্যরা লজ্জাজনকভাবে পিছু হটে।
আফগান যুদ্ধের সেই হার তাদের চোখ খুলে দিল। বুঝল, শুধু লাঠির জোরে পশতু ও বালোচদের দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই তারা কৌশল বদলাল। যুদ্ধের বদলে চুক্তি করল, মোটা অঙ্কের ভাতা দিল। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে নিরুৎসাহিত করল, বাধা দিল।
এক গোত্রকে আরেক গোত্রের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিল। সেই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি—ভাগ করে শাসন করো। সবকিছু মিলিয়ে এমন এক চাল চালল, যাতে গোষ্ঠীগুলো নিজেরাই নিজেদের সঙ্গে লড়তে থাকে, ব্রিটিশদের দিকে নজর না দেয়।
তবে ব্রিটিশরা কিন্তু এই গোষ্ঠীগুলো যে শক্তিধর, তাদের মানসিকতা যে অন্যান্য গোষ্ঠীর চেয়ে আলাদা, সেটা পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। বরং তারা বলল, ‘এই জাতগুলো যুদ্ধ করতে ভালোবাসে, লড়াই এদের রক্তে মিশে আছে। তাহলে আমরা এদের আমাদের জন্যই লড়াইয়ে নামাই!’
এভাবেই তৈরি হলো পশতুদের নিয়ে ‘পাঠান রেজিমেন্ট’ আর বালুচদের নিয়ে ‘বালুচ রেজিমেন্ট’। পরে পাঠান রেজিমেন্টকে একীভূত করা হয় ‘ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট’-এর সঙ্গে।
পশতু আর বালোচ—এই দুই জাতের মানুষই কঠোর নিয়মকানুন মানে। তবে পার্থক্যও আছে। সেটা কোথায়? পশতুদের কাছে ধর্ম ছিল সবচেয়ে বড়। ধর্মের জন্য তারা জীবন দিতেও রাজি। আর বালোচদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের ভূমি, নিজের গোত্র আর নিজের সরদার। তাদের কাছে এই তিনটিই ছিল আসল সত্য।
এদের মধ্যে বালোচদের সামলানো পশতুদের তুলনায় কিছুটা সহজ ছিল। ব্রিটিশরা বুঝতে পারল, গোত্রপ্রধানদের খুশি করতে পারলে গোটা গোত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তাই তারা কিছু প্রভাবশালী বালুচ সরদারকে সম্মান দিল। যেমন কালাতের খান। তার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া হলো, যাতে তিনি অন্য বালুচ সরদারদের বশে রাখতে পারেন।
এ ছাড়া একটা সুবিধা ছিল। আর তা হলো বালোচিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান। অঞ্চলটা বিশাল। মরুভূমি আর পাহাড়ে ঘেরা। কোথাও কোথাও যেতে কয়েক দিন লাগত। ফলে এই বিচ্ছিন্ন এলাকায় কেউ কী করছে, ব্রিটিশদের সেদিকে তেমন নজর দিতে হয়নি। পাকিস্তান সরকারের অবস্থাও অনেকটা তা-ই।
পাকিস্তানের দাবি, বালোচিস্তানে বর্তমান অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতায় আফগান তালেবান এবং তাদের সহযোগী তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) সরাসরিভাবে দায়ী।
আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে তারা পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নিয়মিত হামলা, বোমা বিস্ফোরণ এবং ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে। আর তাদের সরাসরি পরিচাললনা করছে ভারত।
এমএম