ভোরের ঘুমন্ত মুহূর্তে প্রলয়ঙ্করি আগুন

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শ্রাবণী মেলার কারণে তারাপীঠের মন্দির সংলগ্ন হোটেলগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সোমবার ভোরের দিকে যখন হোটেলের আবাসিকরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক তখনই ভবনটির একতলায় প্রথম আগুনের সূত্রপাত ঘটে।

প্রাথমিক তদন্তে দমকল ও পুলিশের অনুমান, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই এই বিধ্বংসী আগুনের সূচনা হয়। একতলায় আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যেই তা বিকট রূপ নেয় এবং হোটেলের ওপরের তলাগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নিচে থাকা দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন ও ধোঁয়া তীব্র আকার ধারণ করে। হোটেলে অবস্থানরত পরিবারগুলোর মধ্যে শিশু এবং প্রবীণ সদস্যও ছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো ভবনটি ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় এবং আগুনের লেলহান শিখা হোটেলের সিঁড়ি ও বেরোনোর একমাত্র পথটি বন্ধ করে দেয়।

হোটেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও উদ্ধার তৎপরতা

হোটেলের মালিক কল্যাণ পাল দুর্ঘটনার তীব্রতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানান, "আমাদের নাইট গার্ড এবং কর্তব্যরত কর্মীরা প্রথম আগুন দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গেই তারা হোটেলের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র সচল করার চেষ্টা করেন এবং প্রধান বিদ্যুৎ সংযোগের তার কেটে দেন। কিন্তু আগুনের গতি এতই দ্রুত ছিল যে সামান্য সময়ের মধ্যেই তা পাঁচতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।"

তিনি আরও জানান, ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই পুরো ভবন বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। আতঙ্কে ঘরে থাকা আবাসিকরা হুড়োহুড়ি করে বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকাণ্ড ধোঁয়া ও সিঁড়িতে আগুন ধরে যাওয়ার কারণে বেরোনোর পথ না পেয়ে ঘরের ভেতরেই অনেকে আটকা পড়েন। বের হওয়ার আকুল চেষ্টায় সিঁড়ি ও করিডোরে গিয়ে অনেকে দগ্ধ হন এবং অক্সিজেনের অভাবে জ্ঞান হারান।

ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের অভিযান

ঘটনার খবর পেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সংকীর্ণ গলি ও মারাত্মক ধোঁয়ার কারণে প্রাথমিক অবস্থায় আগুন নেভানো ও ভেতরে উদ্ধারকাজ চালানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। পরে দমকলকর্মীরা অক্সিজেন মাস্ক ও বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং কাঁচের জানালা ভেঙে ভেতরের ধোঁয়া বের করার ব্যবস্থা করেন।

দীর্ঘক্ষণের চেষ্টায় দমকলকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। ভেতর থেকে বেশ কয়েকজন অচেতন ও গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে নিকটস্থ রামপুরহাট মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা ছয়জনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শ্রাবণী মেলায় ট্র্যাজেডি ও সুরক্ষার প্রশ্ন

শ্রাবণ মাসে তারাপীঠ মা তারার দর্শনে প্রতিবছরই লাখ লাখ ভক্তের সমাগম ঘটে। আনন্দের এই পরিবেশে এমন মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে হতবাক দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্ত ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল কি না এবং আপৎকালীন বেরোনোর পথ (Emergency Exit) উন্মুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে বীরভূম জেলা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট।

এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার সবরকম ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে তারাপীঠের অন্যান্য হোটেলগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালু আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য দ্রুত পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এমএম