সোমবার (১০ আগস্ট) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ভূমিকম্পে পশ্চিম কলম্বিয়ার কালি, পেরেইরা, কুইবদো ও মানিজালেসসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পার্শ্ববর্তী ইকুয়েডর ও পানামাতেও কম্পন অনুভূত হয়।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, রাজধানী বোগোটা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমারে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল। ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে এর কেন্দ্র ছিল। মূল কম্পনের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২১টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে।
কালিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ
দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালি ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, সেখানে অন্তত ২০টি ভবন পুরোপুরি বা আংশিক ধসে পড়েছে এবং আরও ৩৮০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধসে পড়া স্থাপনাগুলোতে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কালির ৬৪ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক হোর্হে মনকায়ো অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, ভবন ধসে পড়ার পর পুরো শহর ধুলোর মেঘে ঢেকে যায়।
তিনি বলেন, তার পুরো বাড়ি কেঁপে উঠেছিল এবং জীবনে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প তিনি আগে দেখেননি। বেঁচে থাকার জন্য তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা
প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার শপথ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। ফলে নতুন প্রশাসন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় সময় দুপুর ১টার দিকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেন, মানুষের জীবন রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে সরকারের সব সক্ষমতা কাজে লাগানো হচ্ছে।
তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করাই সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
দে লা এসপ্রিয়েলার দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ১১১ জন নিহত ও ৮৭ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়ার পাশাপাশি বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রিসারালদা অঞ্চলের অন্তত ৪০ জন রয়েছেন। অঞ্চলটির রাজধানী পেরেইরাও ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সেখানে ধসে পড়া ভবনগুলোতে জীবিতদের উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
এ ছাড়া ভ্যালে দেল কাউকা অঞ্চলে তিন শিশুসহ অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিখোঁজের তালিকায় ১,৪০০-এর বেশি মানুষ
ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পর সোমবার বিকেলে মানুষ ডিজিটাল ডেটাবেসে তাদের নিখোঁজ স্বজনদের তথ্য দিতে শুরু করেন। সেখানে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের নাম যুক্ত হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই কালি ও পেরেইরা শহরের বাসিন্দা। সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা আরও বাড়ছে।
পেরেইরায় প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে ভূমিকম্পের ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানবন্দরের ছাদের একটি অংশ আশ্রয় নেওয়া যাত্রীদের ওপর ধসে পড়ছে। এ সময় আতঙ্কে তাদের চিৎকার করতে দেখা যায়। অন্য একটি ফুটেজে চারতলা একটি ভবন ধসে পড়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।
ভূমিকম্পের পর স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা যাচাই করতে প্রকৌশলীদের দিয়ে কাঠামোগত পরিদর্শন শুরু করা হয়েছে। এ কারণে কলম্বিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পশ্চিমাঞ্চলের পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেন্তুরাসহ কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প
কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক পরিষেবা জানিয়েছে, সোমবারের ভূমিকম্পটি একবিংশ শতাব্দীতে দেশটিতে রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভূকম্পবিদ সুজান ভ্যান ডার লি বলেন, ভূমিকম্পটির গভীরতা তুলনামূলক বেশি হলেও এর মাত্রা, স্থলভাগের ভেতরে অবস্থান এবং স্ট্রাইক-স্লিপ ধরনের গতিবিধির কারণে ঘনবসতিপূর্ণ উপত্যকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যেতে পারে।
তার ভাষ্য, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে ছিল। ফলে তাত্ত্বিকভাবে কম্পনের প্রভাব কিছুটা কম হওয়ার কথা। কিন্তু ভূমিকম্পটির মাত্রা এত বেশি ছিল যে তা সত্ত্বেও অত্যন্ত শক্তিশালী কম্পন সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা