রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোটার ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন এবং ছয়জন ভোটদান থেকে বিরত থাকেন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ হয়। পরদিন সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের কাছে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করেন মির্জা ফখরুল।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের সংসদ সদস্য এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
শৈশব থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। পরে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্রনেতা হিসেবে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
শিক্ষাজীবন শেষ করে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে রাজনীতি ও মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার আগ্রহে পরবর্তীতে শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপে। পরবর্তী সময়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও শক্ত হয়। পরে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি হন। ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও আন্দোলনের সময়ে মির্জা ফখরুল দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পর অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে দলীয় কর্মকাণ্ডে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করায় দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দৃশ্যমান নেতৃত্ব দেন তিনি।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বিভিন্ন সময়ে তাকে কারাবরণও করতে হয়েছে।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পরে বিএনপি সরকারের সময়ে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন। বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হলেও বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদে যোগ না দেওয়ায় তিনি শপথ নেননি।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে নতুন অধ্যায়
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছাত্রনেতা, শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব—বিভিন্ন ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব নেওয়াকে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একসময় শ্রেণিকক্ষে অর্থনীতি পড়ানো শিক্ষক থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় যুক্ত হয়েছে নতুন এক অধ্যায়।
ব্যক্তিজীবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাহাত আরা বেগম একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন এবং সিডনিতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
এনএইচ