রোববার রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা হলে এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা ছাত্র সংসদ ‘অগ্নিঝরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাদরাসা : ছাত্র-শিক্ষকদের অবদান ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, মাদরাসাকে অবহেলা করার প্রবণতা শুরু হয় শেখ মুজিব যখন ইসলামের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিলেন, তখন থেকে। কারণটা হলো, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই। আমরা মনে করেছিলাম, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জালিম। এজন্য তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের জনগোষ্ঠী মজলুম হিসেবে সে জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতার পর দেখা গেল, এ জালিম-মজলুমের লড়াইকে অনেকটা ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এজন্য আলেমদের তখন থেকে নিগৃহীত করার কালচার শুরু হয়েছিল।

১৯৭২ সালে শেখ মুজিবের সময়ের ইতিহাস তুলে ধরে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, সে সময় আলেমদের পালিয়ে বেড়াতে হতো, আলেম দেখলেই তাদের রাজাকার এবং রাষ্ট্রবিরোধী বলে অপমান করা হতো। তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে নির্মমভাবে, কোনো বিচার ছাড়াই।

মাদরাসার ছেলেদের যে অবদান, সেটা স্বীকার করতে আমাদের সমাজে এক রকম কুণ্ঠা আছে উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাই বিপ্লবে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ভূমিকা রেখেছেন, আমরা তাদের নামগুলো পত্রিকায় খুব একটা দেখি না। অন্য প্রতিষ্ঠানের নামগুলো যত দেখি, কাহিনি যতটা পড়ি, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদেরটা সেভাবে পড়ি না। আমাদের দৃষ্টিতে সব শহীদের একই মর্যাদা, একই সম্মান। আমাদের দেশে মাদরাসা ছাত্রদের প্রতি বৈষম্য সে স্বাধীনতার পর থেকেই করা হচ্ছে।

সমাজে আলেমদের ছোট করে দেখার কালচারের প্রমাণ শাপলা চত্বরে দেখতে পেয়েছি উল্লেখ করে এনইসির যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, শাপলা চত্বরের গণহত্যার পর সমাজে প্রতিবাদ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। কারণ সেখানে মাদরাসার ছেলেদের হত্যা করা হয়েছে। গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের হত্যা করা হয়েছে। সেজন্য এটা তাদের মানসিকতাকে আহত করেনি।

তিনি বলেন, এ থেকে আমাদের বুঝতে হবে, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের যেটা প্রাপ্য সম্মান, সেটা আদায় করে নিতে হবে। কোনো রাষ্ট্র কিংবা বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা সে সম্মান আপনাদের কখনো দেবে না। মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে যেতে হবে বলেও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।

পতনের শেষদিকে এসে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা যখন তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল, এ বিপ্লবকে পরাভূত করার জন্য, তখন তা’মীরুল মিল্লাত এবং অন্য মাদরাসার ছেলেরা টঙ্গী, উত্তরা এবং বিশেষ করে যাত্রাবাড়ীতে যে লড়াই করেছে, সেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ইনশাআল্লাহ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যাতে ইতিহাস বিস্মৃত না হয়, সেজন্য আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, যতদিন আমার দেশ পত্রিকা আমরা চালিয়ে যেতে পারব, আল্লাহর রহমতে, ততদিন আমরা জুলাইয়ের চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে রাখব।

শেখ হাসিনা কওমি সনদ দিয়ে আলেমদের নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি করেছিল উল্লেখ করে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, এর মধ্যে কোনো সম্মান ছিল না। রাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্মান চাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, বরং তা আদায় করে নিতে হবে। সেটা আপনারা শুরু করেছেন এ জুলাই বিপ্লবে আপনাদের ভূমিকার মধ্য দিয়ে। জুলাই বিপ্লবে আপনাদের ভূমিকা প্রমাণ করেছে, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ছাড়া দেশে কোনো বিপ্লব সম্পন্ন হতে পারে না।

জ্ঞানবিজ্ঞানে মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের এগিয়ে যেতে হবে উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, আপনারা যদি জ্ঞান ও নৈতিকতায় নেতৃত্ব দিতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব আপনাদের কাছে চলে আসবে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ইতিহাস রচনা হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই।

দিল্লিতে বসেও হাসিনার ষড়যন্ত্র থেমে নেই উল্লেখ করে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, তিনি বলছেন ডিসেম্বরে ফিরে আসবেনÑএটা কিন্তু তার বক্তব্য না। এটা তাকে দিয়ে ভারত বলায়। কেন বলানো হচ্ছে-এটা আমাদের বুঝতে হবে। আমি মনে করি, আপনারা সবাই রাজনীতি বোঝেন। কাজেই আমাদের আগামী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আমি আহ্বান জানাব, সে লড়াইয়ে জুলাইযোদ্ধা যারা ছিলেন, তারা যে দলেরই হোন না কেন, সেটা বিএনপি হোক, জামায়াত হোক- সব জুলাইযোদ্ধা ফ্যাসিবাদ প্রতিহত করার জন্য এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদী দিল্লির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকবেন, এটাই আমার প্রত্যাশা।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন তা’মীরুল মিল্লাত মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানী। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগা।

মাদরাসার ছাত্র সংসদের ভিপি তোফায়েল আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন-ইসলামি স্কলার মুফতি আলী হাসান উসামা, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির আবদুস সবুর ফকির, শায়খুল হাদিস আবু তাহের জিহাদি, তানযিমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাবীবুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল, মুফাসসিরে কোরআন আবুল কাশেম রাযি প্রমুখ।

এমএম