দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার তাড়াহুড়া করতে চাইছে না বিএনপি। বরং দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি দক্ষতা, বিচক্ষণতা, সাহসিকতা এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে দলটি।

বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলটি মূলত তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রথমত, দেশ ও দলের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। দ্বিতীয়ত, দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা। তৃতীয়ত, জাতীয় সংকটে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার মতো সাহসিকতা।

দলটির নেতারা মনে করেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় শুধু দলীয় আনুগত্য যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক সংকটের সময়ে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ক্ষেত্রে দলীয় প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও অবস্থানের কারণে বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। পরে তিনি পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থানও বিএনপিবিরোধী হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য থাকলেও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও নেতৃত্বের অভাব ছিল বলে বিএনপির ভেতরে মূল্যায়ন রয়েছে। অনেকের মতে, ওই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিণতিতে এক-এগারোর জরুরি সরকারের পথ তৈরি হয়।

তবে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের ভূমিকা বিএনপির কাছে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। দলটির মতে, সে সময় তার দৃঢ় অবস্থানের কারণে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তি। তার ভাষায়, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি। তাই এ পদে এমন একজনকে বসানো প্রয়োজন, যিনি ব্যক্তিগত সততা, গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার প্রতীক হবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীও মনে করেন, নিছক দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সমীচীন নয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় সংকটের সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তাই এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করা উচিত, যিনি কোনো দলের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, যিনি প্রকৃত অর্থে দেশের অভিভাবক হতে পারবেন, তাকেই রাষ্ট্রপতি করা উচিত। তার মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয় স্বার্থ ও গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারও বলেন, ‘দেশের রাষ্ট্রপতি হতে হবে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থে দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি পদটি যেন কোনো দলীয় অন্ধ আনুগত্য বা কানাঘুষার কেন্দ্রবিন্দু না হয়। যিনি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হবেন; জনগণ, দেশ এবং সংবিধানের প্রতি তার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। বিশেষ করে, যে কোনো বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাকে শক্ত ও অনড় অবস্থান নিতে হবে। অতীতে আমরা রাজনীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রপতি খুব কমই দেখেছি। কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে, মানুষ দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে সক্ষম-এমন একজন নিরপেক্ষ ও যোগ্য রাষ্ট্রপতিই প্রত্যাশা করে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। বিতর্ক এড়িয়ে যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও সংকট মোকাবিলায় সক্ষম ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিতে চায় বিএনপি।

এনএইচ