জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে শহীদদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের সুস্থতা কামনায় শুক্রবার (৩১ জুলাই) বাদ জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত দোয়া মাহফিল-পূর্ব আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন ধরনের কোটা চালু করেছিল, আর বর্তমান সরকার চালু করেছে ‘বিএনপি কোটা’। সরকার সর্বত্র নিলজ্জভাবে দলীয়করণ করছে। রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক, ব্যাংক-বিমা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দিরসহ সর্বত্র দলীয় লোকজন দিয়ে দখল করে দলীয় প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া হচ্ছে। এই সরকার বৈষম্য সৃষ্টি করছে, অথচ এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, সরকারের একজন মন্ত্রীও স্বীকার করেছেন যে, জুলাই বিপ্লবের পরও কিছুই পরিবর্তন হয়নি; সবকিছু আগের মতোই চলছে। তাহলে প্রশ্ন হলো- কেন কিছুই পরিবর্তন হয়নি? কেন সবকিছু আগের মতোই চলছে? এর কারণ, সরকার জুলাইয়ের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে না হেঁটে ফ্যাসিবাদের পথেই হাঁটছে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সবকিছুর পরিবর্তন হবে। আগের মতো আর কিছুই চলবে না। জাতি একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে পাবে। জাতিকে সেই নতুন বাংলাদেশ উপহার দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সরকার যদি সেই দায়িত্ব পালনে বিরোধী দলের সহযোগিতা চায়, তবে জামায়াতে ইসলামী সেই সহযোগিতা করবে, ইনশাআল্লাহ।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপির সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ১৯৪৭ সালে মুক্তি, ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের অবসান— এসব অর্জনের পরও জাতির ভাগ্যের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। এ কারণেই জুলাই আন্দোলনে মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখেছিল।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, এত রক্ত ও আত্মত্যাগের পরও যদি রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে আবার রাজপথে নামতে হয়, তাহলে সেই আত্মত্যাগের মূল্য কোথায়? শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। আর সে জন্য গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি।
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো ভুলে গেলে শহীদদের সঙ্গে বেইমানি করা হবে। শহীদদের আকাঙ্ক্ষার নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, শহীদরা ন্যায়, ইনসাফ ও বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য জীবন দিয়েছেন। কিন্তু জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকার সেই চেতনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে পুরোনো ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির দিকেই দেশকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই সরকার গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না। তবে শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যাবে না।
সভাপতির বক্তব্যে নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন জুলাই বিপ্লবের কারণেই নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশের ভিত্তিতে একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হওয়ার কথা ছিল এবং তাদের দুটি শপথ নেওয়ার বিধান ছিল। জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল দুটি শপথই গ্রহণ করেছে। কিন্তু বিএনপি কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে বিএনপি শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে এবং জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লব কেবল ক্ষমতার পালাবদলের জন্য হয়নি; রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল এর লক্ষ্য। গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সেই আকাঙ্ক্ষার পক্ষে মত দিয়েছেন।
তিনি জুলাই শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করার দাবি জানান এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এ দাবি আদায়ে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মহানগরীর কর্মপরিষদের সদস্য ড. মোবারক হোসাইন ও শাহীন আহমেদ খান, সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন, সহকারী মিডিয়া সম্পাদক আশরাফুল আলম ইমনসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজ আদায়কারী বিপুলসংখ্যক মুসল্লি দোয়া মাহফিলে অংশ নেন।
আলোচনা সভা শেষে শহীদদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের সুস্থতা কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
এনএইচ