সেদিন জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা না পেলেও সাদিয়া আফরিন পায় বাড়ির কাজ (পড়া)। পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহের বুধবার সেই বাড়ির কাজ এনে জমা দিয়ে নতুন করে বাড়ির কাজ নিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক। সাদিয়া আফরিনকে ঠিক করে দেন পড়াশোনার রুটিন।

বাড়ির কাজ (পড়া) শেষ করে প্রতি বুধবার যথাসময়ে জেলা প্রশাসকের কাছে হাজির হয় ছাত্রী সাদিয়া আফরিন। তার এই রুটিন চলতে থাকে নিয়মিত। এর এক বছর পর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশগ্রহণ করে সাদিয়া আফরিন। প্রকাশিত ফলাফলে জিপিএ-৫ অর্জন করে সে।

ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর জেলা প্রশাসক তার ফেসবুক পেজে সাদিয়া আফরিনকে নিয়ে একটি পোস্ট দেন। যাতে তিনি পুরো গল্প তুলে ধরেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

সাদিয়া আফরিন দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের মাসিমপুর সরকার পাড়ার মিল শ্রমিক সেলিম ও গৃহবধূ আরফা বেগমের ৩ সন্তানের মধ্যে বড়।

সাদিয়া আফরিন পুলহাট কাদের বকস মেমোরিয়াল কলেজিয়েট হাই স্কুলের শিক্ষার্থী। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ৪৩ জন অংশ নেয়। এর মধ্যে ২২ জন পাস করেছে। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়া আফরিনই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

সরেজমিনে সাদিয়ার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই শতক জায়গার ওপর একটি টিনের ঘর ও আঙিনা। ঘরটির মাঝখানে পুরাতন কাপড় পর্দর মতো টেনে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক পাশে থাকেন সাদিয়া ও তার মেজ বোন এবং অপর ভাগে থাকেন মা-বাবা ও ছোট বোন। সাদিয়ার ঘরে পড়ার মতো নেই কোনো টেবিল চেয়ার। বিছানায় কিংবা মেঝেতে বসে পড়াশোনা করতে হয় সাদিয়াকে।

তবে সাদিয়া আফরিনের এসএসসির ফলাফলে শিক্ষক, পাড়া প্রতিবেশী, সহপাঠী ও তার স্কুলের শিক্ষার্থীরা সবাই খুশি হলেও বাবা মায়ের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। তারা মেয়ের পড়ালেখা চালিয়ে নিবেন কীভাবে সেই চিন্তায় এখন দিশাহারা।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জুলাইয়ে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছিলেন মা আরফা বেগম। এক সপ্তাহ পর মেয়েসহ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন মা আরফা বেগম। এসময় জেলা প্রশাসক তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেন। পড়াশোনা নিয়ে সাদিয়াকে নানা প্রশ্ন করেন। সেদিন বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিতে পারেনি সাদিয়া। কিন্তু তার আত্মবিশ্বাস ও মেধার বিষয়টি ঠিক ধরেছিলেন জেলা প্রশাসক। তাই প্রথম দেখার দিনেই জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম তাকে আর্থিক সহায়তা করেননি। বরং তিনি সাত দিনের বাড়ির পড়া দিয়ে ঠিক করে দিয়েছিলেন কীভাবে এই পড়া করে প্রস্তুতি নিতে হবে। যেই কথা সেই মোতাবেক কাজ। সাদিয়া আফরিনও জেলা প্রশাসকের দেওয়া পড়া ও নিয়ম মানতে শুরু করে।

জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে বলেন, রাতে দুই ঘণ্টা আর ভোরে দুই ঘণ্টা পড়তে হবে। রাত ১০টায় ঘুমাবে এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠবে। বিকেলে এক ঘণ্টা খেলবে। ক্লাস হোক বা না হোক, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাবে। রুটিন অনুসরণ করলে চার মাস পর আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন। যদিও পরের মাসেই সাদিয়াকে দেওয়া হয় সাত হাজার টাকা। জেলা প্রশাসকের দেওয়া রুটিন অনুযায়ী প্রতি বুধবার গণশুনানির দিন সকালে নিয়ম করে মাকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে পড়া দিয়ে স্কুলে ক্লাসে যেত সে।

মেয়ের এমন সাফল্যে খুশি বাবা সেলিম ও মা আরফা বেগম। নিজেরা পড়ালেখা করতে না পারলেও কষ্ট করে মেয়েদের পড়ালেখা করাতে চান তারা। পাশাপাশি বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া একমাত্র ছাত্রীর কারণে খুশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

বাবা সেলিম বলেন, সাদিয়া খুবই মেধাবী। কিন্তু আমি একটি মিলের কর্মচারী হিসেবে কাজ করি। আমার স্ত্রী বাসায় সেলাইয়ের কাজ করে। সামান্য অর্থ দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া করা খুবই কষ্টকর। পরে আমার মেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে পড়ালেখা চালানোর জন্য আর্থিক সাহায্যের জন্য যায়। সেখানে জেলা প্রশাসক তাকে পড়া দেন এবং প্রতি বুধবার যেতে বলেন। আমার মেয়েকে পড়াশোনা করার জন্য রুটিন ঠিক করে দেন। আজ আমার মেয়ে পুরো স্কুলের মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে। মেয়ে ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু সামনে তাকে পড়াশোনা করানোর মতো আমাদের সামর্থ্য নাই।

মা আরফা বেগম বলেন, স্বামী-স্ত্রী মিলে কাজ করে যে আয় হয় তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালানোই কঠিন। আবার এক বছর আগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় স্বামীর টাকা দিয়ে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তখন মানুষের কাছে শুনেছিলাম যে, জেলা প্রশাসক পড়ালেখার জন্য আর্থিক সাহায্য করেন। এজন্য আমি মেয়েকে নিয়ে ডিসি স্যারের কাছে যাই। তিনি আমার মেয়েকে বাড়ির কাজ দেন। প্রতি বুধবার ডিসি অফিসে গিয়ে পড়া দিয়ে নতুন পড়া নিয়ে আসার জন্য বলেন। আমার মেয়ে সেই মোতাবেক পড়াশোনা করে। আজ মেয়ের এমন ফলাফলে আমরা খুবই খুশি। আমি শিক্ষকদের পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রী সাদিয়া আফরিন বলেন, আমাকে জেলা প্রশাসক স্যার যেভাবে বলেছেন আমি সেভাবেই পড়াশোনা করেছি। আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি। আমি পড়াশোনা করে ডাক্তার হতে চাই।

কাদের বকস মেমোরিয়াল কলেজিয়েট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী বলেন, সাদিয়া আফরিন খুবই মেধাবী ছাত্রী। সে নিয়মিত জেলা প্রশাসক স্যারের কাছে পড়া জমা দিয়ে নতুন পড়া নিয়ে আসত। সে প্রতি বুধবার সকাল ৯টার মধ্যে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যেত এবং সকাল ১০টার মধ্যে স্কুলে উপস্থিত হতো। তার ফলাফলে আমরা খুবই খুশি।

এদিকে সাদিয়া আফরিন জিপিএ-৫ পাওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সাদিয়া আফরিনের সঙ্গে কথা বলে প্রথম দিনেই বুঝেছিলাম সে মেধাবী। সেই মেধা বিকাশে তাকে একটু সহযোগিতা ও পড়াশোনার কৌশল জানিয়ে দেওয়া দরকার। আমি সেই কাজটিই করেছি। সে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে।

এনএইচ