পরে এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ছোট ভাই খন্দকার রেদোয়ানুল ইসলাম বাদি হয়ে মিঠাপুকুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দীক অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যুবলীগ নেতা রওজার হোসেন শয়ন ও আওয়ামী লীগ কর্মী ইদ্রিস আলী লায়নের নেতৃত্বে লায়নের ভাগনে মোকছেদুল, মোকলেছুর,মোকতারুল ইসলাম, আকতার হোসেন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সাংবাদিকের পরিবারের ওপর হামলা চালায়।
এর আগে শনিবার ‘মিঠাপুকুরে বিএনপির কমিটিতে যুবলীগ নেতা’ শিরোনামে একটি সংবাদ আমাদের সময়সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর জেরেই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ সূত্রে জানা যায়।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ভাংনী ইউনিয়নে সদ্য অনুমোদিত ২নং ওয়ার্ড বিএনপির কমিটিতে ওই ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি রওজার হোসেন শয়নকে যুগ্ম সম্পাদক ও বিগত নির্বাচনের সময়ে আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতি করা ক্যাডার গ্রুপের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ কর্মী ইদ্রিস আলী লায়নকে ২ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই কমিটি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দৈনিক আমাদের সময়সহ একাধিক গণমাধ্যমে গত ১ মার্চ ‘মিঠাপুকুরে বিএনপির কমিটিতে যুবলীগ নেতা’ এই শিরোনামে একটি সংবাদ প্রচারিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই সদ্য বিএনপিতে যোগদান করা যুবলীগ নেতা শয়ন ও লায়ন সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিকের ওপর বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি ধামকি দিতে থাকে। এরই জেরে রোববার বিকেল ৪ টার সময় সদ্য কমিটি পাওয়া বিএনপি নেতা ইদ্রিস আলী লায়নের ভাগনে মোকছেদুল, মোকলেছুর,মোকতারুল ইসলাম, আকতার হোসেন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে দৈনিক আমাদের সময়ের রংপুর প্রতিনিধি খন্দকার রাকিবুল ইসলামের বসতভিটার সীমানা সংলগ্ন একটি কাঁঠাল গাছ কাটতে থাকে।
এতে ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ছোট ভাই খন্দকার রেদোয়ানুল ইসলাম বাধা দিলে তাকে বেধড়ক মারধর করে।
স্থানীয়রা আহত রেদোয়ানুল ইসলামকে উদ্ধার করে মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কল দেওয়া হলে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিক খন্দকার রাকিবুল ইসলাম জানান, গত এক যুগ আওয়ামী ক্যাডার পরিচয়ে ভাংনী ইউনিয়ন এলাকার ত্রাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তি বিএনপিতে পদ পাওয়া নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। পরে ওই ক্যাডারের ভাগনে আমার পরিবারের ওপর হামলা চালায়। হামলা চালানোর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এই দেশে সংবাদকর্মীরাই যদি নিরাপত্তা না পায় তাহলে প্রশাসন সাধারণ মানুষকে কীভাবে নিরাপত্তা দিবে।
মিঠাপুকুর থানা পুলিশের এএসআই মো. মিঠুন জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কল পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। পরে ভুক্তভোগী সাংবাদিক পরিবারকে থানায় অভিযোগ দেওয়ার জন্য বলেছি।
মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দীক জানান, গণ্ডগোলের খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠিয়েছিলাম। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ছোট ভাই বাদী হয়ে মিঠাপুকুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, উপজেলার ভাংনী ইউনিয়নের বিএনপির ২নং ওয়ার্ড কমিটি গঠিত হয় গত শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি)। তৎকালীন বিএনপির ভাংনী ইউনিয়নের আহ্বায়ক মাহবুব আলম ও সদস্য সচিব আব্দুল হামিদ হাই স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রওজার হোসেন শয়নকে যুগ্ম সম্পাদক ও ইদ্রিস আলী লায়নকে ২নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এ কমিটি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, বিগত নির্বাচনকালীন সময়ে জোর করে নৌকা মার্কায় একাই ২০০/৩০০ করে সিল মেরেছিল ইদ্রিস আলী মণ্ডল লায়ন। তাকে সবাই আওয়ামী লীগের ক্যাডার বলেই জানতাম। এখন হঠাৎ করে টাকার বিনিময়ে কীভাবে বিএনপিতে ঢুকল তা আমাদের অজানা। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ২নং ওয়ার্ডের নেতৃত্বে ছিল রওজার হোসেন শয়ন ও ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল ইদ্রিস আলী লায়ন। এখন শুনছি লায়ন নাকি আগে থেকেই বিএনপি করে।
এ বিষয়ে কথা বলতে রওজার হোসেন শয়ন ও ইদ্রিস আলী লায়নের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা জানান, এক সঙ্গে দল করলাম। আমরা সবাই পালিয়ে আছি। এখন আমার সহযোদ্ধা কীভাবে যেন বিএনপি নেতা হয়ে গেল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাংনী ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা জানান, রওজার হোসেন শয়ন ও ইদ্রিস আলী লায়ন দুজনই আওয়ামী লীগের ক্যাডার। এটা সবাই জানে। কিন্তু এবারের সেক্রেটারি পদপ্রার্থী মোসলেম ও সভাপতি মাহবুব আলম দলীয় নির্বাচনে তাদের ভোট বাড়ানোর জন্য আওয়ামী লীগের এই দুই ক্যাডারকে কমিটিতে পদ দিয়েছিল।
এ বিষয়ে ভাংনী ইউনিয়নের তৎকালীন বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুল হামিদ হাই বলেন, কমিটির সবকিছু সভাপতি করেছে। আমি এদের ভালোভাবে চিনি না।
ভাংনী ইউনিয়ন বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক ও বর্তমান সভাপতি মাহবুব আলম জানান, রওজার হোসেন শয়নের ব্যাপারে আমি ভালোভাবে জানি না। যারা তাকে কমিটিতে রাখার বিষয়ে সুপারিশ করেছে তাদের সঙ্গে কথা বলে তার বিষয়ে জানাতে পারব। আর ইদ্রিস আলী মন্ডল লায়ন ২০১০ সাল থেকেই ওই ওয়ার্ডের বিএনপির সেক্রেটারি ছিলেন। বিএনপির সেক্রেটারি আগে থেকে থাকলে রাশেক রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে বছরের পর বছর কীভাবে নৌকার পক্ষে ভোট ডাকাতিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। হয় তো লায়নের আত্মীয়স্বজন কেউ ভোটে দাঁড়িয়েছিল।
মিঠাপুকুর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোতাহারুল ইসলাম নিক্সন (পাইকার) বলেন, আওয়ামী লীগের লোক বিএনপিতে পুনর্বাসন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এনএইচ