ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস ও গত রাতে পুলিশের করা মামলার প্রতিবাদে উপজেলার গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ভাঙ্গা উপজেলা পরিষদ ও ভাঙ্গা থানায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেন বিক্ষোভকারীরা। এসময় ভাঙ্গা অফিসার্স ক্লাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ইউএনও ও নির্বাচন কমিশন অফিসে আগুন দেওয়াসহ সেখানে থাকা কয়েকটি গাড়ি ও আটটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর চালায় তারা। এ সময় ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ।
এ সময় সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে গেলে তাদেরকেও বাধা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়।
বিক্ষোভকারীদের থামাতে পুলিশের একটি দল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে গেলে তারা জনতার ধাওয়ার মুখে পড়ে এবং পাশের মডেল মসজিদে আশ্রয় নেয় বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। এসময় ভাঙ্গা থানা ঘেরাওসহ পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া, এপিবিএনকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস ও পুলিশের করা মামলার প্রতিবাদে উপজেলার গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এসময় আলগী ও হামিরদী ইউনিয়ন ছাড়াও ভাঙ্গার বাকি ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার বাসিন্দারা সমর্থন জানিয়ে জড়ো হয়। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন তারা।
এর আগে ভোর থেকে অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও দুপুর ১২ টার আগে থেকে ফের তারা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন। পরে দুপুর ১টার পর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে একযোগে হামলা চালায় সরকারের বিভিন্ন স্থাপনায়।
এসময় সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্দোলনকারীদের বাধা দিলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রোকিবুজ্জামান জানান, ভাঙ্গা থানা ঘেরাও সহ একটি গাড়িতে আগুন ও কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে বিক্ষোভকারীরা। এছাড়া ইউএনও ও নির্বাচন কমিশন অফিসে আগুন দেওয়া সহ সেখানে থাকা কয়েকটি গাড়ি ও আটটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর চালায় তারা।
বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান জানান, তারা কার্যালয় থেকে নিরাপদ স্থানে আছেন। কারো ওপর হামলার ঘটনা ঘটেনি। তবে ইউএনও কার্যালয়ের কিছু অংশে ভাঙচুর করা হয়েছে। নির্বাচন কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে আন্দোলনকারীরা।
এদিকে বিকেল সাড়ে তিনটার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এসময় স্বল্প পরিসরে যান চলাচল করতে দেখা যায় মহাসড়কে।
আজ সকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির জন্য আন্দোলনকারীরা সড়কের পাশে অবস্থান নেন। তবে বেলা ১১টার দিকে তারা ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের দুটি স্থানে অবরোধ শুরু করেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
এর আগে, গতরাতে ভাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে ৯০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। এতে আলগী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক ম ম সিদ্দিক মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। শনিবার রাতে তাকে নগরকান্দা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলায় বলা হয়, 'ফরিদপুর-৪ আসনের পুনর্বিন্যাসের দাবিতে ম ম সিদ্দিক মিয়ার নেতৃত্বে একদল বিক্ষোভকারী ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের সুয়াদী এলাকায় সিসিবিএল পেট্রোল পাম্পের সামনে সমবেত হন। তারা রাস্তায় গাছ ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন এবং যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। পুলিশের বাধা অমান্য করে তারা আরও উত্তেজিত অবস্থান নেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মৌখিক সতর্কতা দিয়ে ধাওয়া করলে বিক্ষোভকারীরা পালিয়ে যান এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।'
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, 'পলাতক ও অজ্ঞাত আসামিরা অবরোধের নামে শক্তি প্রদর্শন করে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করেছেন এবং মহাসড়কে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে তারা দ্রুত বিচার আইন ২০০২ (সংশোধিত ২০১৪) এর ৪(১)/৫ ধারার অপরাধ করেছেন।'
ভাঙ্গা থানার ওসি মো. আশরাফ হোসেন বলেন, '৯০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও এক থেকে দেড়শ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।'
গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আন্দোলনকারীদের সতর্ক করে বলেন, দুপুরের মধ্যে অবরোধ তুলে না নিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, সড়ক ও রেলপথে অবরোধ সহ্য করা হবে না। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে।
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের আসন পুনর্বিন্যাসের গেজেটে ফরিদপুর-৪ আসন থেকে ভাঙ্গার আলগী ও হামিরদী ইউনিয়নকে ফরিদপুর-২ আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এর প্রতিবাদে গেজেট প্রকাশের পর পাঁচ দিন মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন স্থানীয়রা। এতে ঢাকা-খুলনা ও ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার যান চলাচল ব্যাহত হয়।