তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, দূতাবাসে হুমকি পাঠানো চক্রটি একটি ‘ভুয়া গ্রুপ’। ই-মেইলে যেসব বিকাশ নম্বর ব্যবহার করে চাঁদা দাবি করা হয়েছে, সেগুলোর কয়েকজন মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাদের সঙ্গে ঘটনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, শুধু চাঁদাবাজি নয়, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও সরকারকে বিব্রত করাও এ ঘটনার অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।

ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে ডিবি ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। হুমকিদাতারা দেশ থেকে নাকি বিদেশ থেকে এ ধরনের ই-মেইল পাঠিয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চার দূতাবাসে হুমকি

রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঢাকায় অবস্থিত তিন-চারটি দূতাবাসে ই-মেইলের মাধ্যমে চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের ই-মেইল পাঠানো হয়েছে কয়েকটি সরকারি দপ্তরেও।

পরে ডিবি সূত্রে জানা যায়, হুমকির তালিকায় চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ চারটি বিদেশি দূতাবাস রয়েছে।

ডিবিপ্রধান বলেন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি ভুয়া গ্রুপ এ কাজ করছে। ই-মেইলে অর্থ পাঠানোর জন্য যেসব বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর সূত্র ধরে তিন-চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়। তবে তারা হুমকি বা চাঁদা দাবির বিষয়ে কিছুই জানতেন না বলে জানান তিনি।

পুলিশের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ই-মেইলে ব্যবহৃত আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমের মালিকদের সঙ্গে মূল হুমকিদাতাদের সরাসরি সম্পর্ক এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকৃত হুমকিদাতাদের শনাক্ত করাই তদন্তকারীদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আতঙ্ক নয়, সতর্ক থাকার পরামর্শ

হুমকির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও পুলিশ দূতাবাসগুলোর প্রতিনিধিদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গুলশান ও বারিধারার কূটনৈতিক এলাকায় পোশাকধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যদের উপস্থিতিও বাড়ানো হয়েছে।

দূতাবাসের সামনে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে কুইক রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

কোনো দূতাবাসের জিডি নেই

হুমকি পাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো দূতাবাস গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা লিখিত অভিযোগ করেনি বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে অভিযোগ না থাকলেও বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ডিএমপির ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। চেকপোস্ট, টহল এবং দূতাবাসগুলোর সামনে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এ ধরনের ঘটনায় দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভাবমূর্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হুমকির সত্যতা যাচাই এবং এর পেছনে কারা রয়েছে, তা দ্রুত শনাক্তে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের আশঙ্কা

ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি নিছক হয়রানি, পূর্বশত্রুতা কিংবা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা কিংবা সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যেও এ ঘটনা ঘটতে পারে।

এর অর্থ হলো, তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে শুধু অর্থ আদায়ের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন না। বিদেশি দূতাবাসগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে হুমকিমূলক বার্তা পাঠানোর কারণে এর পেছনে বৃহত্তর কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ডিবি জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে এবং দ্রুতই রহস্য উদ্ঘাটনের আশা করছে তারা। অপরাধীদের শনাক্ত করা গেলে তাদের আইনের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন ডিবিপ্রধান।

সরকারি দপ্তরেও একই কৌশল

শুধু বিদেশি দূতাবাস নয়, কয়েকটি সরকারি দপ্তরেও একই ধরনের ই-মেইল পাঠিয়ে চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। একই পদ্ধতিতে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর ঘটনায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

তদন্তকারীরা এখন ই-মেইলের উৎস, ব্যবহৃত অ্যাকাউন্ট, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত তথ্য এবং অর্থ পাঠানোর জন্য দেওয়া মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নম্বরগুলো বিশ্লেষণ করছেন। হুমকিদাতারা কোন জায়গা থেকে ই-মেইলগুলো পাঠিয়েছে, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

মাঠে ডিবি-সিটিটিসি

হুমকির ঘটনায় ডিএমপির ডিবি ও সিটিটিসির কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে তদন্ত চালাচ্ছেন। প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ই-মেইলে ব্যবহৃত বিকাশ নম্বরের মালিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃত হুমকিদাতারা অন্যের পরিচয় বা আর্থিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নিজেদের আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছে।

এখন মূল প্রশ্ন—কারা এই ই-মেইল পাঠিয়েছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী? চাঁদা আদায়, হয়রানি, ব্যক্তিগত শত্রুতা, নাকি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পরিকল্পনা—তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তবে কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে হুমকিদাতাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে ডিবি। ফলে এখন নজর তদন্তের পরবর্তী ধাপে—ই-মেইলের আড়ালে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিদের পরিচয় কত দ্রুত বের করতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেটিই দেখার বিষয়।

এমএম