সোমবার (২৪ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভারতের হাইকমিশনার এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আলাদা ধারায় এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ফুটে ওঠে।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকবেই। তবে এর প্রভাব অর্থনীতির ওপর পড়বে না। আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ভালো হবে বলেও তিনি আশাবাদ জানান।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের নানা বিষয়ে অস্বস্তি তৈরি হলেও দুই দেশই সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। গত কয়েক সপ্তাহে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগও বেড়েছে। ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বাইরে রাখার একটি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘রাজনীতি চলবে তার পথে’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘রাজনীতি তার নিজের পথে চলবে, কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।’ তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্টতই দুই দেশের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় স্বার্থকে আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। ফলে রাজনৈতিক অস্বস্তির মধ্যেও অর্থনৈতিক যোগাযোগ সচল রাখাকে উভয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একাধিকবার ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পারস্পরিক বিশ্বাস ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। দুই দেশের উদ্বেগ ও মতপার্থক্য মুখোমুখি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
বাণিজ্য সম্পর্কই বড় পরীক্ষার জায়গা
রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রশ্নটি এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহু বছর ধরে বিস্তৃত হয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ, স্থলবন্দরভিত্তিক বাণিজ্য এবং বিভিন্ন পণ্যের আমদানি-রপ্তানি এ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় শুল্কবহির্ভূত বাধা, পণ্যের মান যাচাই, পরীক্ষার জটিলতা, প্রক্রিয়াগত বিলম্ব ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মতো বিষয় সামনে এসেছে। এসব সমস্যা দূর করা গেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের পোশাক, বস্ত্র, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য, সিরামিক, প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের জন্য ভারতের বাজার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে ভারতের জ্বালানি, কাঁচামাল, শিল্পপণ্য ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক অস্বস্তির মধ্যেও অর্থনৈতিক স্বার্থ
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বেশ কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
তবে একই সময়ে ঢাকা ও দিল্লি উভয় পক্ষ থেকেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহের বার্তা এসেছে। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করার আগ্রহের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
এই বাস্তবতায় দীনেশ ত্রিবেদীর অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক যেন তার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সামনে সহযোগিতার সুযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা অনেক বিস্তৃত। সীমান্তবাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি, শিল্প বিনিয়োগ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিমসটেকসহ আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগ আরও বাড়ানো সম্ভব।
সম্প্রতি ভারতীয় হাইকমিশনারও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎমুখী সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে অতীতের মতপার্থক্য অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান ছিল।
বাংলাদেশের জন্যও ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাণিজ্যিক ভারসাম্য, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ফলে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু আমদানি-নির্ভর না হয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সম্পর্কের নতুন সমীকরণে অর্থনীতির গুরুত্ব
দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ভৌগোলিক নৈকট্য, ঐতিহাসিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার সুযোগও সীমিত। বরং রাজনৈতিক মতপার্থক্য মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো সচল রাখাই উভয় দেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি একদিকে রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন, অন্যদিকে অর্থনীতিতে এর প্রভাব না পড়ার আশাবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও ভালো হবে বলেও প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা চললেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার দরজা খোলা রাখার বার্তা দিয়েছেন ভারতের হাইকমিশনার। এখন সেই বার্তা বাস্তবে কতটা রূপ নেয়, তা নির্ভর করবে দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতি, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক বাধাগুলো দূর করার উদ্যোগের ওপর। রাজনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলাতে অর্থনীতি যে গুরুত্বপূর্ণ সেতু হতে পারে, দীনেশ ত্রিবেদীর সোমবারের বক্তব্যে সেই সম্ভাবনাই নতুন করে সামনে এসেছে।
এমএম