সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, রোববার (৩০ আগস্ট) দিবাগত রাতে সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের দক্ষিণ এলাকার একটি সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলযোগে যাচ্ছিলেন জাহেদুল ইসলাম। এ সময় আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত তার মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তাকে ঘিরে ধরে। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় উপর্যুপরি কোপানো হয়।

আহত অবস্থায় জাহেদ সড়কে পড়ে গেলে স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে পথেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।

ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সিএমপির তালিকায় এক নম্বরে

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জাহেদুল ইসলাম ওরফে ‘পিচ্চি জাহেদ’ দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের অপরাধজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। চলতি বছরের শুরুতে জননিরাপত্তার স্বার্থে চট্টগ্রাম নগরীতে ৩৩০ জন দুষ্কৃতকারীর প্রবেশ ও অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় সিএমপি। ওই তালিকায় এক নম্বরে ছিলেন জাহেদ।

তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই তার বিরুদ্ধে আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে বিবেচিত নয়।

চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সাতকানিয়ার পুরানগড় এলাকায় সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর একটি অভিযানে জাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ১০৪টি ইয়াবা ও ১৫টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।

গ্রেপ্তারের পর তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। জামিনে মুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে প্রকাশ্যে সড়কে থামিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটল।

হত্যার নেপথ্যে কী?

জাহেদ হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তবে প্রাথমিকভাবে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, মাদক ও অস্ত্রের কারবার, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, অপরাধী গ্রুপগুলোর মধ্যে বিরোধ কিংবা পুরোনো শত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।

তবে এসবের কোনোটিকেই এখনো হত্যাকাণ্ডের নিশ্চিত কারণ হিসেবে উল্লেখ করছে না পুলিশ। তদন্তের পরই হত্যার প্রকৃত কারণ এবং কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতে সড়কে জাহেদের গতিরোধ করে হামলার ঘটনাটি ছিল আকস্মিক ও পরিকল্পিত। হামলাকারীরা আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল কি না, ঘটনার সঙ্গে কতজন জড়িত ছিল এবং হামলার পর তারা কোন দিকে পালিয়েছে এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে কি না, প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে এবং হত্যাকাণ্ডের আগে জাহেদের সঙ্গে কারও বিরোধ বা যোগাযোগ হয়েছিল কি না—তদন্তে এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।

পুরোনো বিরোধের সূত্র খুঁজছে পুলিশ

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, জাহেদ দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের অপরাধজগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত শত্রুতা ছাড়াও অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে জাহেদের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো অপরাধী গ্রুপের দ্বন্দ্ব চলছিল কি না কিংবা মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের আগে জাহেদের গতিবিধি, তিনি কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিলেন এবং কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ময়নাতদন্তের পর মরদেহ হস্তান্তর

হামলায় জাহেদের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে আঘাতের ধরন ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকায় থাকা একজন আলোচিত ব্যক্তিকে নগরীর বাইরে সাতকানিয়ায় পরিকল্পিতভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্র ও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে একাধিক মামলার আসামি একজন ব্যক্তি জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফেরার পর কীভাবে আবারও সহিংসতার শিকার হলেন—তদন্তে এ বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং এর পেছনে কারা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। পুলিশ বলছে, তদন্ত এগোলেই ঘটনার নেপথ্যের তথ্য বেরিয়ে আসবে।

এমএম