এর মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সনাতন বা ম্যানুয়াল চালান ব্যবস্থা। আজ (মঙ্গলবার) অর্থ বিভাগের এক নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কিংবা অধীন দপ্তর এ-চালানের বাইরে অন্য কোনো মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব বা প্রাপ্তি সংগ্রহ করতে ও জমা দিতে পারবে না। বর্তমানে সরকারি অর্থ সংগ্রহে ব্যবহৃত পৃথক কোনো ব্যবস্থা থাকলে তাও অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে সংরক্ষিত সরকারি অর্থ আজ ৩০ জুনের মধ্যে সরকারের ‘ট্রেজারি সিংগেল অ্যাকাউন্টে’ (টিএসএ) স্থানান্তরের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, সরকারি অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা, নগদ ব্যবস্থাপনাকে ব্যয়-সাশ্রয়ী করা এবং ভুয়া চালান তৈরির ঝুঁকি সম্পূর্ণ নির্মূল করতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে কার্যকর হতে যাচ্ছে, যখন এ-চালান প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার ও লেনদেনের পরিমাণে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ৪ লাখ ৭ হাজার ২২৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ-চালানে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

একই সময়ে ৬ কোটি ৭৫ লাখ চালান প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। অথচ ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র ১৭টি চালানের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল। গত সাত অর্থবছরে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ১৯ কোটি ৩ লাখের বেশি চালান প্রক্রিয়াকরণ এবং ১০ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে।

অনলাইন লেনদেনেও সাড়া

তথ্য বলছে, এ-চালান এখন শুধু একটি প্রযুক্তিনির্ভর পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনলাইন চালানের সংখ্যা ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ কোটি ৩৬ লাখে পৌঁছেছে। অনলাইনে আদায়ের পরিমাণ ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৯৮ কোটি ১২ লাখ টাকায়। একই সঙ্গে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) লেনদেনের মাধ্যমেও ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। অতীতে সরকারি ফি বা রাজস্ব জমার জন্য নির্দিষ্ট ব্যাংক শাখায় গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এতে সেবাগ্রহীতাদের সময় ও শ্রম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সরকারি কোষাগারে অর্থ স্থানান্তরে বিলম্ব এবং ভুয়া চালান তৈরির বড় ঝুঁকি থাকতো। এ-চালান ব্যবস্থা এসব সীমাবদ্ধতা দূর করেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের শাখা কাউন্টার, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড এবং বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় ও ট্যাপের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে যেকোনো স্থান থেকে সহজেই সরকারি রাজস্ব ও ফি জমা দেওয়া যাচ্ছে। অর্থ জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডিজিটাল চালান রসিদ তৈরি হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য।

অর্থ বিভাগ বলছে, এ-চালানের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের ফলে সরকারের প্রকৃত নগদ অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অলস পড়ে থাকা সরকারি অর্থের পরিমাণ কমবে। এ ছাড়া, এই ব্যবস্থায় অর্থ জমা হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো ক্রেডিট স্ক্রল সরাসরি আইবাস++ (iBAS++)-এ আপলোড হওয়ায় হিসাব মিলানোর ত্রুটি ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। একই সঙ্গে এ-চালান ড্যাশবোর্ড ও অনলাইন যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে যেকোনো চালানের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা যায়, যা রাজস্ব ফাঁকি ও জাল দলিল প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখছে।

এমএম