ফলে প্রশ্ন উঠছে ছোট ঋণগ্রহীতার জন্য যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এত কঠোর, বড় ঋণ খেলাপিদের ক্ষেত্রে সেটিই কেন বারবার নমনীয় হয়ে পড়ছে?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ গত দেড় দশকে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০০৯ সালে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ এক হাজার কোটি টাকায়। এরপর পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়।
২০২৬ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই দশকেরও কম সময়ে খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি।
এর আগে ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় প্রায় ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ বাড়ছে, কমছে না
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে নীতি সহায়তা, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও ঋণ আদায়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমার পরিবর্তে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করেছে। এগুলো হলো—রাজনৈতিক প্রভাবে অপরিণামদর্শী ঋণ বিতরণ, ব্যাংকিং খাতে দুর্বল তদারকি এবং ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা।
গত দুই দশকে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারিও খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে যে হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়, অনেক ব্যাংক সেটিও যথাযথভাবে রাখতে পারছে না। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও তারল্য পরিস্থিতির ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বড় খেলাপিরা কেন শাস্তির বাইরে?
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে ঋণ খেলাপি মূলত দেওয়ানি বিষয়। ব্যাংককে মামলা করে ঋণ আদায় করতে হয়। আর অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীবের মতে, বিদ্যমান আইনে ‘উইলফুল ডিফল্টার’ বা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখনো সম্ভব হয়নি।
অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা নিষ্পত্তিতে পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে ব্যাংকগুলোও মামলা করতে অনেক সময় অনাগ্রহী থাকে। কারণ মামলা হলে ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে ওই ঋণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে বড় ঋণ খেলাপিদের বড় একটি অংশ শিল্পগোষ্ঠী। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি জড়িত। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপে ফেললে কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় সরকার ও ব্যাংক অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার নীতি নেয়।
এর সুযোগে পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন কিংবা অন্যান্য নীতি সুবিধা পাওয়ার পথ তৈরি হয়। রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘রক্ষকের ভক্ষক’ হলে সমস্যা আরও বাড়ে
বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো পরিচালকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্রহণ।
কখনো কখনো ব্যাংকের পরিচালক বা তাদের ঘনিষ্ঠজনদের মালিকানাধীন কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেওয়া হয়। এতে ঋণ অনুমোদন, তদারকি ও আদায়—তিন ক্ষেত্রেই স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকের মালিকানা ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে এমন সম্পর্ক থাকলে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষও কঠোর অবস্থানে যেতে পারে না।
আবারও বড় খেলাপিদের জন্য ছাড়
খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৩১ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে নীতি সহায়তা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন ব্যবস্থায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর তা পরিশোধে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না।
এই সুবিধা নিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে হবে। ব্যাংকগুলো আবেদন নিষ্পত্তি করবে ডিসেম্বরের মধ্যে।
এর আগেও বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিভিন্ন সময়ে পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরের একটি প্রজ্ঞাপনে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের স্থিতির বিপরীতে কমপক্ষে দুই শতাংশ নগদ অর্থ জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। নিয়মিত হওয়ার পর দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ পরিশোধে ১০ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়ার কথাও বলা হয়।
একই সময়ে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল।
কেন ছাড় দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক?
বড় খেলাপিদের এ ধরনের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তিও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কমেছে।
অন্যদিকে বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর ব্যবসায়ীদের সুদ ব্যয় বেড়েছে। বিক্রি ও ব্যবসায়িক আয় কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৮ মাসের রোডম্যাপের অংশ হিসেবেও বড় ঋণগ্রহীতাদের অতিরিক্ত সময় দেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি হলো, আদালতে মামলা করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে এখনই ঋণের একটি বড় অংশ আদায় করা গেলে ব্যাংকের তারল্য বাড়বে। একই সঙ্গে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হলে কর্মসংস্থানও রক্ষা করা যাবে।
‘কাগজে কমবে, বাস্তবে নয়’—সমালোচনা
তবে বড় খেলাপিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ছাড়ের এ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে।
তাদের আশঙ্কা, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমলেও বাস্তবে ব্যাংকের হাতে কত টাকা ফেরত আসবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এ ধরনের সুবিধা নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের জন্যও বৈষম্য তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতাকে উৎসাহিত করার ঝুঁকি রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, নীতি সুবিধার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো খেলাপি আরও বেশি খেলাপির দিকে যেতে পারে। এ কারণে ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের পাশাপাশি ব্যাংকের নিজস্ব জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ।
কঠোরতার দৃষ্টান্তও জরুরি
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু ছাড় নয়, একই সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থার দৃষ্টান্তও তৈরি করতে হবে।
তাদের পরামর্শের মধ্যে রয়েছে—ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ, অর্থঋণ আদালতে দ্রুত বিচার এবং ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর নিষেধাজ্ঞা।
বড় খেলাপিদের নতুন ব্যবসা গ্রহণ কিংবা বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের মতো পদক্ষেপের কথাও বলেছেন কেউ কেউ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় ঋণ খেলাপি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ পরিশোধের ইতিহাস ক্রেডিট রিপোর্ট ও স্কোরে বড় প্রভাব ফেলে, ফলে ঋণখেলাপিরা নতুন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। ভারতে ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংক্রাপ্টসি কোডের মাধ্যমে বড় করপোরেট ঋণখেলাপিদের সম্পদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশেও অর্থঋণ আদালতসহ ঋণ আদায়ের আইনি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তুলনামূলকভাবে কম।
‘উইলফুল ডিফল্টারের সংস্কৃতি’ ভাঙতে হবে
বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীবের মতে, বাংলাদেশে ‘উইলফুল ডিফল্টারের কালচার’ তৈরি হয়েছে, যা ভাঙা সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে কঠোর হাতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া নীতি সুবিধা যেন ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিরা অপব্যবহার করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হওয়া উচিত নয়।
যারা সুযোগ পাওয়ার পরও ঋণের অর্থ ফেরত দেবে না, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সেটিও আগে থেকেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সদিচ্ছাই বড় পরীক্ষা
খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তার বড় পরীক্ষা হবে বাস্তবায়নে।
কারণ, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার সমস্যাগুলো দূর করা না গেলে শুধু পুনঃতফসিল কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
ড. আহসান হাবীবের মতে, রাজনৈতিকভাবে ব্যাংকগুলোকে প্রভাবমুক্ত রাখা গেলে বর্তমান উদ্যোগগুলো আর্থিক খাতকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে কিছুটা সহায়তা করতে পারে।
তার ভাষায়, এখন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। দ্রুত এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে মূলত ঋণগুলো নিয়মিত করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে।
তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফেরাতে আরও সময় লাগবে।
সবশেষে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে-ছাড় দিয়ে কতটা ঋণ উদ্ধার হবে, আর কতটা নতুন করে ‘খেলাপি হওয়ার সংস্কৃতি’কে উৎসাহিত করবে?
কারণ, আজকের ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ যদি কঠোর জবাবদিহির আওতায় না আসে, তাহলে আগামী দিনে এর বোঝা আরও বড় হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না
এমএম