রোববার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম এলাকায় ওই সোফা কারখানায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। কারখানার ভেতরে থাকা শ্রমিকদের অনেকেই আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়েন।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আত্রাই উপজেলার ১০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নওগাঁর ১০, নাটোরের ৩

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কালিকাপুর ইউনিয়নের কলি (৩০), লুৎফর (৩২), জান্ডার, রুবেল, বিশা এলাকার সাগর, মজিদুল, দুবাই এলাকার শুভ, সুমন, পারকাসুন্দা গ্রামের জালাল এবং উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ শেখ।

অন্যদিকে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার নিহত তিনজন হলেন খাজুরা ইউনিয়নের দিঘির পাড় গ্রামের শামীম হোসেন, শ্রীপুর গ্রামের সাব্বির হোসেন এবং মহিষডাঙ্গা গ্রামের রবিউল আউয়াল।

নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের অনেকেই এখনো প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

ঘটনাস্থলে ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য

এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের লেবার কাউন্সেলর মো. রেজা রাব্বির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ঘটনাস্থলে ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা নিশ্চিত করেছেন।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতেও মৃতদের সবাই বাংলাদেশি বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় নিহতের সংখ্যা এবং মৃতদের জাতীয়তা সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য পেতে আরও সময় লাগতে পারে।

ফলে বর্তমানে বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে নওগাঁর ১০ জনসহ বাংলাদেশির মৃত্যু ১৩ জন নিশ্চিত হয়েছে; অন্যদিকে ঘটনাস্থলের ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী মোট ১৬ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছে। চূড়ান্ত সংখ্যা শনাক্তকরণ ও যাচাই শেষে নিশ্চিত হবে।

স্বজনদের আহাজারি

প্রবাসে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন নিহত শ্রমিকরা। কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কেউ আবার স্ত্রী-সন্তান ও বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডে তাঁদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের বাড়িগুলোতে শুরু হয়েছে কান্নার মাতম। স্বজনদের অনেকেই প্রিয়জনের মৃত্যুর খবর বিশ্বাস করতে পারছেন না। কেউ অপেক্ষা করছেন মরদেহ শনাক্ত হওয়ার, কেউ অপেক্ষা করছেন সৌদি আরব থেকে বিস্তারিত খবর আসার।

লাশ দেশে ফেরাতে উদ্যোগ

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নিহত প্রবাসীদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তাঁদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, আরিফুল হক চৌধুরী ২০২৬ সাল থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

আগুনের কারণ এখনো অজানা

কী কারণে কারখানাটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করছে। আগুন লাগার সময় কারখানায় কতজন শ্রমিক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি ছিলেন—এ বিষয়েও চূড়ান্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সেখানে কর্মসংস্থানের জন্য যান। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে এমন দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো প্রবাসী শ্রমিক সমাজের জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।

এর আগে জাতিসংঘের এক ফোরামেও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

সৌদির এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এখন সবচেয়ে বড় দাবি—নিহতদের মরদেহ দ্রুত শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা।

এমএম