মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন করে ৯ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ জনে। একই সঙ্গে একদিনে ১ হাজার ৫৭১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও বাড়ছে চাপ। এর মধ্যে একদিনে ৯ জনের মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। বর্ষাকাল ও এর পরবর্তী সময়ে এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে দেখা যায়। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে বাড়িঘর, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্রসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলে তা ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এবারের পরিস্থিতিতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। কারণ, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুরুতর রোগীর সংখ্যাও বাড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং দুর্বলতা। তবে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার আগে লক্ষণগুলোকে সাধারণ জ্বর হিসেবে মনে হতে পারে। এ কারণে জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর কমে যাওয়ার পরও কোনো কোনো রোগীর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই শুধু জ্বর কমেছে বলেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে একদিনে মৃত্যুর যে রেকর্ড ছিল, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৯ জনের মৃত্যু সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে ১ হাজার ৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও চলতি বছরের একদিনের সর্বোচ্চ সংখ্যা।
ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি এডিস মশার বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এডিস মশা সাধারণত মানুষের বসতবাড়ির আশপাশেই প্রজননের সুযোগ পায়। তাই বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র, নির্মাণসামগ্রী কিংবা অন্য কোনো স্থানে পানি জমে আছে কি না—নিয়মিত তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরিষ্কার রাখা ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে নগর ও স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানো কঠিন হতে পারে।
একদিনে ৯ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। চলতি বছরে ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম, রোগী শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও দায়িত্ব নিতে হবে। বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এদিকে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, চলতি বছরে একদিনে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ৯ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির নতুন এক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩০ জন। এখন ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং আরও প্রাণহানি ঠেকানোই সংশ্লিষ্ট সবার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এমএম