সরেজমিনে সকাল ৯টার দিকে হাসপাতালে ঢুকতেই বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে বিপুলসংখ্যক রোগীর ভিড় দেখা যায়। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সকাল থেকেই রোগীরা এসে ভিড় জমায়। এছাড়া ইমার্জেন্সিতে রোগীর আসা-যাওয়া অব্যাহত ছিল। ডায়রিয়া, হাম ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ দেখা যায় ওয়ার্ডগুলোতে। এতে দৃশ্যটি জবুথবু অবস্থা দেখা যায়। এমনকি রোগীর চাপে শয্যা সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এক বিছানায় ৩-৪ জন, হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
কয়েকজন রোগীর স্বজন অভিযোগ করেছেন, হাসপাতাল থেকে ঠিকমতো ওষুধ, ইনজেকশন দেওয়া হয় না। বাইর থেকে কিনতে হয়। বাড়তি চাপ সহ্য করতে না পেরে হাসপাতালের নার্সরাও রোগীসহ তাদের স্বজনদের সঙ্গে রুঢ় আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবার জন্য প্রত্যেক উপজেলাতেই সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। তবে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট অত্যন্ত প্রবল। হাসপাতাল থাকলেও নেই চিকিৎসকসহ নির্দিষ্ট জনবল। তবে সবচেয়ে বেশি রোগীর চাপ থাকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে।
শুরুতে সদর হাসপাতালটি ছিল একটি ডিসপেনসারি। এটি ১৯৭২ সালে ৩১ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ১৯৮৪ সালে লক্ষ্মীপুর জেলা হওয়ার পরে এটি ৫০ শয্যায় ও ২০০৩ সালে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। প্রায় ২৩ বছর আগে সদর হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো পর্যন্ত নির্ধারিত জনবল নিয়োগ হয়নি। ৫০ শয্যারও কম জনবল দিয়ে চিকিৎসা সেবা চলছে এ হাসপাতালে। এদিকে ২০১৭ সালে ১৪ মার্চ হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের জুনে ১৫০ শয্যার ৮ তলা ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়, তবে ৮ বছর ২ মাস পার হলেও ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি।
এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসকসহ ১৮৮ পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১০১ জন। এরমধ্যে চিকিৎসক থাকার কথা ছিল ৫৭ জন, রয়েছে মাত্র ১৮ জন। চিকিৎসকদের মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট গাইনী, মেডিসিন, ইএনটি, জুনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি, চক্ষু ও ইএনটিসহ ৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। এছাড়া হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০-৪০০ জন রোগী ভর্তি থাকে। কখনো কখনো ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪০০ ছেড়ে বেশি যায়। ১০০ শয্যার হাসপাতালটিতে তখন রোগীর চাপে জবুথবু অবস্থা সৃষ্টি হয়। শয্যা সংকটে এক বিছানায় ৩-৪ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়। পুরুষ, মহিলা, শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডসহ বারান্দার মেঝেতে অতিরিক্ত বিছানায় রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। এই বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা সেবা দিতে বেগ পোহাতে হয় হাসপাতালে দায়িত্বরত স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসকের। নার্স সংকটেও সেবা ব্যহত হচ্ছে।
অন্যদিকে শনিবার পানিসম্পদ মন্ত্রী ও লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি হাসপাতাল পরিদর্শন করে রোগী, তাদের স্বজন ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় দ্রুত ১৫০ শয্যার নতুন ভবনের কাজ শেষ করে আগামি মার্চের মধ্যে উদ্বোধনের জন্য সংশ্লিষ্টদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
রোগীর স্বজনরা জানায়, হাম-ডেঙ্গু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে। একটি বিছানায় ৩-৪ জন রোগী। এতে স্বজনদের খুব কষ্ট করতে হচ্ছে রোগী নিয়ে। বেডের পাশে মেঝেতেও রোগী রয়েছে। পা ফেলার মতো জায়গা নেই। এছাড়া হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। অধিকাংশ ওষুধ বাহির থেকে কিনতে হয়।
বাঙ্গাখাঁ এলাকার দোলন আক্তার নামে এক তরুণী জানান, তার সন্তান হামে আক্রান্ত। চিকিৎসকরা ভর্তি দিয়েছে হাসপাতালে। তবে এক বিছানায় ৩ জন। এখানে থাকার অবস্থা নেই। এজন্য তিনি শিশুটিকে নিয়ে বাসা এবং হাসপাতালে আসা যাওয়া করেন।
কুশাখালীর ঝাউডগি গ্রামের হাজেরা বেগম নামে এক নারী বলেন, ৪ দিন ধরে হামে আক্রান্ত নাতিকে নিয়ে তিনি হাসপাতালে রয়েছেন। ঠিকমতো ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। বাইরে থেকেই বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে হয়।
সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার জহুরুল ইসলাম রনি বলেন, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হাম-টায়ফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ বাড়ছে। কোভিডের সময় যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হয়েছে, এসব রোগ প্রতিরোধে একই ধরণের সচেতনতা অবলম্বন করা জরুরি। প্রতিদিনই ৪০-৫০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এতে চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমাদেরকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) অরুপ পাল বলেন, ১০০ শয্যার হাসপাতালে আমাদের প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ জন রোগী ভর্তি থাকে। এই বিপুল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে চিকিৎসক, নার্স ও সেবাদানকারী কর্মীদের হিমশিম খেতে হয়। তারপর রাতদিন পরিশ্রম করে আমরা রোগীদেরকে চিকিৎসা দিচ্ছি। অতিসত্ত্বর ২৫০ শয্যা সম্পুর্ণভাবে চালু হলে আমাদের রোগীর চাপ, চিকিৎসকসহ জনবল সংকট অনেকাংশে লাঘব হবে। রোগীরা স্বাচ্ছন্দে চিকিৎসা সেবা নিতে পারবে।
লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন বাহারুল আলম বলেন, আউটডোরে প্রতিদিন আমাদের প্রায় ২ হাজার রোগী সামাল দিতে হচ্ছে। আমাদের পর্যাপ্ত ওষুধ আছে। কিন্তু সবরোগী যেন ওষুধ পায়, এজন্য রেশনিং করে প্রয়োজন অনুযায়ী দিচ্ছি। ডেঙ্গু, হাম ও ডায়রিয়া রোগী এখানে আছে। হামরোগীদের টিকা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এমএম