বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতির প্রতিফলন। হাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ টিকাদানের কভারেজে ঘাটতি। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের এমএমআর টিকা না পাওয়া বা ডোজ অসম্পূর্ণ থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহজ প্রবেশাধিকার না থাকাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের প্রতিটি শিশুকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এমএমআর টিকার আওতায় আনতে হবে। যারা টিকা মিস করেছে, তাদের জন্য ক্যাচ-আপ কার্যক্রম চালানো জরুরি। দুর্গম এলাকা, বস্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভ্যাকসিন সরবরাহ, কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তাঁরা আরও বলছেন, শক্তিশালী রোগ নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সন্দেহভাজন রোগী দ্রুত শনাক্ত, ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতকরণ এবং তাৎক্ষণিক রিপোর্টিং নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো এলাকায় সংক্রমণ দেখা দিলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গণসচেতনতা বৃদ্ধি ও ভ্রান্ত ধারণা দূর করাও জরুরি। টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও অবহেলায় তা মারাত্মক হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ৬ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ১ জন নিশ্চিত আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৬ দিনে মোট ১৬৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ২৪১ জন শিশু; সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা ১২ হাজার ৩২০।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এর পরেই রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ১৫০ শিশু নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত হয়েছে এবং সন্দেহজনক লক্ষণ নিয়ে আরও ৫০৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, প্রত্যেকদিন মৃত্যুর কথা শুনতে হবে। শত শত শিশু আক্রান্ত হবে। হাসপাতালগুলো সয়লাব হয়ে যাবে রোগীতে এবং নতুন করে ওয়ার্ড খুলতে হবে। এগুলো কোনোটাই কাম্য নয় এবং গ্রহণ করার মতো নয়, অগ্রহণযোগ্য। হাম অবশ্যই ঠেকানো যেত। স্বাস্থ্যবিভাগ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করার কারণে আমরা এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে হামের মহামারী চলছে। এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় বিপর্যয়। এমন ঘটনা নজিরবিহীন এবং আগে ঘটেনি। কয়েক বছর ধরে টিকার সংকট চলছে। কোনো কোনো শিশু প্রথম ডোজ পেলেও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি, ফলে পূর্ণ সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। টিকার সংকটে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও সচেতন হতে হবে।

অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, হামের চিকিৎসায় গাইডলাইন প্রণয়ন, চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ জরুরি। টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু মৃত্যুর অর্থ কোথাও ঘাটতি রয়েছে; তাই নিয়মিত নজরদারি ও চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু তালহা বলেন, বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির মূল কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে তাদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় টিকাদানের কভারেজ কমে গেছে। টিকা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণাও সংক্রমণ বাড়াচ্ছে।

হাম প্রতিরোধে সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। প্রথম ধাপে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় টিকা দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ কয়েকটি সিটিতে ১২ এপ্রিল থেকে টিকাদান শুরু হবে। ৩ মে থেকে দেশব্যাপী এই কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে এই টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ইতোমধ্যে ভ্যাকসিন আসা শুরু হয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে।

তিনি বলেন, সাধারণত ৯ মাস বয়সে শিশু ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা পায়। তবে এবার দেখা যাচ্ছে, আক্রান্তদের ৩৩ শতাংশ এই বয়সের আগেই সংক্রমিত হয়েছে। অর্থাৎ ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ছে। ২০২৪ সালে নিয়মিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না হওয়াও বর্তমান পরিস্থিতির একটি কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এস