নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার শান্তিতে নোবেলের জন্য মোট ২৮৭টি মনোনয়ন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি সংগঠন রয়েছে। তবে মনোনীতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে না নোবেল কমিটি।

নিয়ম অনুযায়ী, মনোনয়নসংক্রান্ত তথ্য ৫০ বছর গোপন রাখা হয়। ফলে কোনো মনোনয়নদাতা নিজে নাম প্রকাশ করলে তবেই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়নের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

আলোচনায় ট্রাম্প:

এবার সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কম্বোডিয়া, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের নেতারা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তারা ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন। তবে নোবেল কমিটি এসব দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন সময়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গত বছরও পুরস্কারের জন্য তার প্রচার ও লবিং আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের শান্তিতে নোবেল পান ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। পরে তিনি তার নোবেল পদক ট্রাম্পকে উপহার দেন।

তবে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, এবার ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ইরান যুদ্ধসহ তার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির কারণে তাকে নোবেল দিলে বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।

অসলোর পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআইও) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন জেরলোরের মতে, গত বছরের নোবেল পুরস্কার ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি এবার কমিটির সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

পোপ লিওর নামও আলোচনায়:

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ লিওর নাম। প্রথম মার্কিন বংশোদ্ভূত পোপ হিসেবে তিনি যুদ্ধ বন্ধ, সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাত নিরসনের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন।

অভিবাসীদের অধিকার, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান ও মানবিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকার কারণে পোপ লিওকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কিছু নীতিরও সমালোচনা করেছেন তিনি।

কার্নি, আন্তর্জাতিক আদালত:

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও এবারের আলোচনায় রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও বাণিজ্যিক চাপের বিরুদ্ধে কানাডার অবস্থান তুলে ধরার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ভূমিকা নজর কেড়েছে।

এদিকে ব্যক্তি ছাড়াও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। আলোচনায় রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে)। আন্তর্জাতিক আইন এবং যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকার কারণে প্রতিষ্ঠান দুটি আলোচনায় এসেছে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কা আলবানিজের নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে। গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর নিয়ে তার অবস্থানের কারণে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন।

সুদানের স্বেচ্ছাসেবীরা:

যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে মানবিক সহায়তা দেওয়া ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস (ইআরআর)-এর নামও এবারের আলোচনায় উঠে এসেছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের এই নেটওয়ার্ক সংঘাতের মধ্যেও সাধারণ মানুষের কাছে খাবার, চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।

যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের সংকটের মধ্যে মানুষের পাশে দাঁড়াতে সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন। মানবিক সহায়তায় তাদের ভূমিকার কারণেই শান্তিতে নোবেলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ইআরআরকে বিবেচনা করা হচ্ছে।

শিশু ও সাংবাদিকদের অধিকার:

ইউক্রেনে শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা মাইকোলা কুলেবা এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেনের নামও আলোচনায় রয়েছে। রাশিয়ার দখলকৃত এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় শিশুদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় কুলেবার ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-এর নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাংবাদিকদের ওপর বাড়তে থাকা ঝুঁকি ও প্রাণহানির কারণে সংগঠনটির কার্যক্রমও গুরুত্ব পেয়েছে।

চমকপ্রদ প্রার্থী আইএসএস:

এবারের আলোচনায় সবচেয়ে চমকপ্রদ নামগুলোর একটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)। পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপসহ বিভিন্ন পক্ষের যৌথভাবে কাজ করার উদাহরণ হিসেবে আইএসএসকে দেখা হয়।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এই প্রকল্পকে পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান বিভাজনের বিপরীতে একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের পরিবর্তে একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রকল্পকেও শান্তিতে নোবেল দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সচিব ক্রিস্টিয়ান বার্গ হার্পভিকেন জানিয়েছেন, বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে এবং নতুন প্রতিষ্ঠান, উদ্যোগ ও সহযোগিতার মডেল তৈরি করছে এমন ব্যক্তিদের ও সংগঠনের দিকেও কমিটির নজর রয়েছে।

তার মতে, ইউক্রেন, সুদান, ইরান, ইয়েমেন ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্ন এবারের শান্তি পুরস্কারের প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সূত্র: রয়টার্স, হিন্দুস্তান টাইমস

এস