সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের কারণে শুরু হওয়া তেল সরবরাহের সংকট বর্তমানে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে গাড়িচালক, ট্রাকমালিক, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়লেই জ্বালানির দাম দ্রুত কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, তেল সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ঝুঁকিও এখনো কাটেনি।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়।

ইরান যুদ্ধের কারণে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এতে তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হলেও যুদ্ধের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।

জ্বালানি বিশ্লেষক জান স্টুয়ার্টের মতে, যুদ্ধগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। শান্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ এখনো রয়ে গেছে।

এ কারণে তেল পরিবহনের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেশি। জাহাজমালিকদের বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে, নাবিকদের বাড়তি অর্থ দিতে হচ্ছে এবং বিমার খরচও বেড়েছে।

অর্থাৎ, তেলের সরবরাহ বাড়লেও সেই তেল পরিবহন করে বাজারে পৌঁছাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

জ্বালানি বাজারে খরচ বাড়ার বড় কারণ তেলবাহী বিশাল জাহাজের ভাড়া।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লার্কসনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পারস্য উপসাগর থেকে চীনে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য একটি বড় তেলবাহী জাহাজের দৈনিক ভাড়া ছিল প্রায় ৬৫ হাজার ডলার।

ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে এই ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় দৈনিক ২ লাখ ৩০ হাজার ডলারে। আর এখন একই পথে একটি জাহাজ ভাড়া করতে প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৬ লাখ ডলার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ টম ক্লোজা এই ভাড়াকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, যুদ্ধের কারণে জাহাজের ক্ষতি না হলে জাহাজের মালিকেরা বিপুল অর্থ আয় করতে পারেন।

তবে জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনাকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালিতে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ রয়েছে।

এ ধরনের ঘটনা জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে পরিবহন খরচও কমছে না।

যুদ্ধের এলাকায় জাহাজ চালাতে নাবিকদের রাজি করানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ঝুঁকিপূর্ণ পথে কাজ করতে তাদের বাড়তি অর্থ দিতে হচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু জাহাজ পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান নাবিকদের প্রতি যাত্রায় ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। এই অর্থ অনেক নাবিকের এক বছরের বেশি সময়ের বেতনের সমান হতে পারে।

অন্যদিকে, যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে জাহাজের বিমার খরচও বেড়েছে। মূল্যবান তেল নিয়ে বিপজ্জনক জলপথ পাড়ি দিতে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশি অর্থ নিচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া-আসার একটি পূর্ণ যাত্রায় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তিন থেকে চার কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।

আগে পারস্য উপসাগর থেকে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনে খরচ হতো প্রায় দুই ডলার। এখন সেই খরচ বেড়ে প্রায় ৩৩ ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ টম ক্লোজা।

এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত তেল ও জ্বালানির দামে যুক্ত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়লেও ভোক্তারা দ্রুত স্বস্তি পাচ্ছেন না।

তেলের বাজারে আরেকটি সমস্যা হলো, আর্থিক বাজারের দাম ও বাস্তবে সরবরাহযোগ্য তেলের দামের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে।

ব্রেন্ট ফিউচারস হলো ভবিষ্যতে তেল কেনাবেচার চুক্তিভিত্তিক দাম। অন্যদিকে, ডেটেড ব্রেন্টের দাম বাস্তবে নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহযোগ্য অপরিশোধিত তেলের বাজারদর নির্দেশ করে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার বাস্তবে সরবরাহযোগ্য ডেটেড ব্রেন্টের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১৩৫ দশমিক ৭৪ ডলার। বিপরীতে, ব্রেন্ট ফিউচারসের দাম ছিল প্রায় ১০০ ডলার।

এই ব্যবধান দেখায়, বাজারে তেল কেনার চুক্তির দাম এবং বাস্তবে তেল হাতে পাওয়ার খরচ এক নয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন ও সরবরাহের ঝুঁকির কারণে বাস্তবে তেল পাওয়ার খরচ বেড়েছে। সেই খরচই পরে পেট্রল ও ডিজেলের দামে প্রভাব ফেলছে।

জ্বালানির সংকট শুধু হরমুজ প্রণালির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে একাধিক সংঘাত বিশ্ববাজারে চাপ তৈরি করছে।

ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজেল রপ্তানিকারক দেশ।

দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির ঘাটতির আশঙ্কায় রাশিয়া রপ্তানি সীমিত করেছে। চীনও নিজেদের বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

এতে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ আরও চাপে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোও উৎপাদনের সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু শোধনাগারে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উৎপাদন কমানো হচ্ছে। আবার দেশটির উপসাগরীয় উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে উৎপাদন ও সরবরাহ আরও ব্যাহত হতে পারে।

বড় ধরনের জ্বালানি সংকট সামাল দিতে দেশগুলো সাধারণত বাণিজ্যিক ও জরুরি মজুত ব্যবহার করে। সরবরাহ কমে গেলে এই মজুত বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি কিছুটা পূরণ করে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সংকটে বিভিন্ন দেশের মজুত দ্রুত কমেছে। ফলে নতুন কোনো বিপর্যয় ঘটলে তা সামাল দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক জান স্টুয়ার্টের মতে, বিশ্ব এখন খুব কম মজুত নিয়ে চলছে। সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থাও আগের তুলনায় দুর্বল।

মজুত কম থাকলে সামান্য সরবরাহের ঘাটতিও বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তেল সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পরও দাম কমার গতি ধীর থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের জাতীয় গড় দাম প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৩৬ ডলারে পৌঁছেছে। বছরের এই সময়ে এর আগে এত বেশি দাম দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা (এএএ)।

ডিজেলের দামও গত মাসে নির্ধারিত সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি রয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খরচ নয়, কৃষি উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয়ও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম স্থিতিশীল করতে শুধু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করাই যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো, শোধনাগারের উৎপাদন স্বাভাবিক করা এবং জ্বালানির মজুত বাড়ানোও জরুরি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ টম ক্লোজার মতে, চলমান সংঘাতগুলোর অন্তত দুটি শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

এনএইচ