মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শেখ হাসিনাকে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান জানায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
নিউইয়র্কে আয়োজিত এক ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থান তুলে ধরেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। গত বুধবার নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে ‘স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি মার্কিন নীতি’ শীর্ষক ওই ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা অংশ নেন।
২০২৪ সালের আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। আন্দোলন দমনের সময় প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে বুধবারের ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চান সাংবাদিকরা। জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নির্ধারণ করেনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিরোধের কারণ হয়ে উঠেছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে ভারত ও বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এ বিষয়ে একটি সমাধানে পৌঁছাবে। তবে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি।
আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের
ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অথবা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্ভাব্য বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়েও জানতে চান সাংবাদিকরা।
আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চাইলে মার্কিন কর্মকর্তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এবং বিএনপির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বর্তমানে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখতে চায়। দেশটিকে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ করার উদ্যোগে ওয়াশিংটন সহযোগিতা করতে আগ্রহী। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি।
এক সাংবাদিক আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি সরাসরি জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের।
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-চীন সম্পর্ক নিয়ে মার্কিন অবস্থান
ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে একইসঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে ওয়াশিংটন কীভাবে দেখে। বিশেষ করে তিন বৃহৎ শক্তির মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে না নিয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা কতটা সম্ভব, সে প্রশ্নও তোলা হয়।
জবাবে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি জটিল আঞ্চলিক বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশের পাশে আকার ও প্রভাবের দিক থেকে বড় প্রতিবেশী দেশ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিটি দেশকে নিজ নিজ আঞ্চলিক পরিসরে অবস্থান বজায় রাখার বিষয়ে উৎসাহিত করে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী করা এবং দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে চায়। একই সঙ্গে কোনো একটি দেশকে বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামনে বিকল্প অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থাকতে চায় বলে জানান তিনি।
নিউইয়র্কে তারেক-ট্রাম্প বৈঠক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য
ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক জানতে চান, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শেষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি লিখে তার সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। নিউইয়র্কে দুই নেতার মধ্যে বৈঠকের কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়।
জবাবে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময়সূচি সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। তবে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের অল্প সময়ের জন্য সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল বলে জানান তিনি। এ সময় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগও হয়েছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সব পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা ছবি তোলার সুযোগ হয়নি।
এর আগে নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিথানী মরিসন দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির আলোকে বক্তব্য দেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে ফটো সেশনেও অংশ নেন।
এনএইচ




