তবে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির বাইরে কোনো সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো নয়। বরং শীতল যুদ্ধের সময় থেকে চলে আসা আঞ্চলিক সামরিক জোট গঠনের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই এটিকে দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পশ্চিমাপন্থী সরকার ও মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা থাকতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিন দেশ চুক্তিতে সই করায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৫৫ সালে গঠিত সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সেন্টোর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সংগঠনটি ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ নামেও পরিচিত ছিল। ওই সময় মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে পশ্চিমা দেশগুলো বিভিন্ন নিরাপত্তা জোট গড়ে তুলেছিল।
মক্কা চুক্তির আগে সৌদি আরব আরও কয়েকটি দেশকে নিয়ে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স (এমএমডিএ) গঠন করেছে। বাহরাইন, বাংলাদেশ, কোমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।
এ জোটের মূল লক্ষ্য লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও এডেন উপসাগরের নৌপথ এবং জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের হামলা ও নৌ অবরোধের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের উদ্যোগ জোরদার হয়েছে।
মক্কা চুক্তির আলোচনায় মিসর ও জর্ডানের অনুপস্থিতিও গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। মিসর এখনো চুক্তি নিয়ে নিজেদের অবস্থান বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইসরাইলের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপের চাপ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই দুই দেশ চুক্তির বাইরে থাকতে পারে। বিশেষ করে ইসরাইলের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সংঘাতের বাস্তবতায় বিষয়টি স্পর্শকাতর।
কিছু ইসরাইলপন্থী বিশ্লেষক মনে করছেন, মক্কা চুক্তি ইসরাইল ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশীদারদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে এই চুক্তিকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখার বিষয়ে আপত্তি রয়েছে।
তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরবও দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও আলোচনা চালিয়ে আসছে। ফলে তিন দেশের সামরিক সহযোগিতাকে সরাসরি ইসরাইলবিরোধী জোট হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পাকিস্তানের অবস্থানও কিছুটা আলাদা। ইসলামাবাদ এখনো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে দেশটির অবস্থানের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যের কিছু বিশ্লেষকের মতে, মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেলে আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য একটি বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির সূচনা হতে পারে। এ ধারণায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে একটি সম্ভাব্য তৃতীয় শক্তিকেন্দ্রের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এ দাবির বিরুদ্ধেও যুক্তি রয়েছে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অংশীদার। ফলে তিন দেশের জোটকে সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনের প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিকেন্দ্র হিসেবে দেখা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
কাতারভিত্তিক মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবেরের মতে, মক্কা চুক্তিকে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যার লক্ষ্য কোনো একক শক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত রাখা।
তবে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, মক্কা চুক্তিকে সম্পূর্ণ স্বাধীন তৃতীয় শক্তিকেন্দ্র হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ চুক্তির তিন দেশই বিভিন্নভাবে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
সব মিলিয়ে মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি সরাসরি ইসরাইলবিরোধী জোট, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর পরিপূরক—তা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হবে। তবে চুক্তিটি যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে, তা স্পষ্ট।
এনএইচ