তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোজাফফরের ফোনে দেশের ভেতর ও বিদেশের বেশ কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব যোগাযোগের উদ্দেশ্য, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর মোজাফফরের বাংলাদেশে প্রবেশ, তার অবস্থান এবং আর্থিক লেনদেনের পেছনে কারা ছিলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় ৪৫ বছর তিনি পলাতক ছিলেন।
ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান হত্যার সময় ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন মোজাফফর। হত্যাকাণ্ডের পর কক্ষের নথিপত্র তল্লাশি এবং মরদেহ সরানোর কাজেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মোজাফফর গ্রেপ্তারের পরই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সময় কার কী ভূমিকা ছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ঘটনার পেছনে কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্র ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যু ঘিরে এখনো অনেক রহস্য রয়েছে। এসব রহস্য উন্মোচনে মোজাফফর গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র। তার সঙ্গে দেশের ভেতর ও বাইরের বেশ কিছু ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ওই ব্যক্তিরা কোনো রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, এত বছর পর কেন মোজাফফরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং কীভাবে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। একই সঙ্গে দেশে প্রবেশের পর কার পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ছিলেন এবং কার সহায়তায় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মঞ্জুরের মৃত্যুও তদন্তে
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সেনানিবাসে ফিরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে দৃশ্যমান উচ্ছ্বাস ছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে। ওই সময় মেজর জেনারেল মঞ্জুর সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছিলেন কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
মঞ্জুরকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজত থেকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল—এ প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
তানভীর হাসান জোহা বলেন, একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে মঞ্জুরকে কেন এবং কোন আইনি ভিত্তিতে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ ঘটনাটি ঘটেছিল বেসামরিক এলাকায় এবং মঞ্জুর তখন পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। তাকে কারা নিয়ে গেলেন এবং পরবর্তীতে কীভাবে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হলো, এসব প্রশ্নেরও তদন্ত প্রয়োজন।
মঞ্জুরের ময়নাতদন্ত কে করেছিলেন এবং তার শরীরে গুলির আঘাতের বিষয়ে কী তথ্য ছিল, সেসব নিয়েও নতুন করে অনুসন্ধান চলছে। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানকে আসলে কে গুলি করেছিলেন এবং মঞ্জুর কীভাবে নিহত হয়েছিলেন—এ দুটি বিষয়ও এখনো অমীমাংসিত বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
দেশি-বিদেশি নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে
পুনঃতদন্তে ওই সময়ের জীবিত সেনা কর্মকর্তাদের বক্তব্য, তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের তথ্য, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন নথি ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের লক্ষ্য শুধু জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা নয়; ১৯৮১ সালের ওই ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, সেটিও খুঁজে বের করা।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। জিয়াউর রহমানের কাছে থাকা একটি ‘গোপন নথি’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা কিছু তথ্য পেয়েছেন। ওই নথিটি কী ছিল এবং জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর সেটির প্রতি কেন এত আগ্রহ দেখানো হয়েছিল, সেটিও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এ ছাড়া লেফটেন্যান্ট মোসলেহ উদ্দিন, মেজর ফজলুল হক, ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ মো. মুনির ও ক্যাপ্টেন মো. ইলিয়াসের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের আশা, মোজাফফরের ফোনের তথ্য, পুরোনো নথি, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে চার দশকের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ রহস্যের জট খুলতে পারে।
এনএইচ