একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার আশঙ্কা, এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া যদি শুধু মামলা ও গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বিমানবন্দরের মূল ব্যবস্থাপনাগত সমস্যাগুলো যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যাত্রীদের ভোগান্তি কমার বদলে প্রতিবাদের জায়গাটি আরও সংকুচিত হতে পারে।
সম্প্রতি মদিনা থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের যাত্রীদের চাপের মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দরের একটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ঘটনাস্থলে গেলে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, হুমকি, আঘাত, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ, অপমান ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বিমানবন্দরে একজন যাত্রী বা নাগরিক কেন ক্ষুব্ধ হলেন—সেই প্রশ্নের উত্তরও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, ট্রলির সংকট, যাত্রীদের ভোগান্তি কিংবা সেবার ঘাটতি যদি সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে এসব সমস্যার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কোনো নাগরিকের আচরণ আইনসঙ্গত ছিল কি না, সেটি তদন্ত ও আদালতের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে বিমানবন্দরের সেবাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সেটিও প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করা দরকার। কারণ একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া গেলেই একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না।
বরং এই ঘটনার পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সামনে একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোথায় ট্রলির সংকট হলো, কেন যাত্রীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেন, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা ছিল কি না এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আগে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর প্রয়োজন।
একইভাবে বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণ, নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে আচরণ কিংবা সরকারি কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। অপরাধ হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তদন্তের আগে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে অভিযোগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ঘটনা যেন বিমানবন্দরের প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল না করে। একজন যাত্রী, সংসদ সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সাধারণ নাগরিক—সবার জন্য বিমানবন্দরের সেবা ও আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড থাকা উচিত।
কারণ বিমানবন্দর শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি দেশের প্রবেশদ্বার। এখানে যাত্রীদের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ, দ্রুত সেবা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। একইভাবে বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে তাই প্রশ্নটি শুধু একজন ব্যক্তির মামলা বা গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও অব্যবস্থাপনা বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
আমার আশঙ্কা, যদি সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের না করে কেবল প্রতিবাদকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াকে সমাধান হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে আরও দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারেন। আর সেই পরিস্থিতি কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ইতিবাচক নয়।
তাই এই ঘটনার একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের সেবাব্যবস্থার অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনা দরকার। অভিযোগ সত্য হলে যার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা প্রয়োজন, আইন অনুযায়ী তা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
শেষ পর্যন্ত একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা একটাই—বিমানবন্দরে অন্যায় বন্ধ হোক, যাত্রী হয়রানি বন্ধ হোক, দায়িত্বে অবহেলার জবাবদিহি নিশ্চিত হোক এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হোক।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের ঘটনাটি যেন কেবল একটি মামলা ও গ্রেপ্তারের সংবাদ হয়ে না থাকে; বরং এটি যেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নতুন করে পর্যালোচনার একটি উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
এমএম











